থমকে আছে খুলনার ১০ মেগা উন্নয়ন প্রকল্প

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১৬:২৮

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: থমকে আছে খুলনার ১০টি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প। কৃষিভিত্তিক ও নদীকেন্দ্রিক শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকা স্বত্ত্বেও অর্থনৈতিক এই জোনে শিল্প বিপ্লবের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে সচল করতে গত এক যুগে একের পর এক অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা নেয়া হলেও খুলনাঞ্চলে কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি। জমি অধিগ্রহণ, প্রস্তাব পাঠানো এবং প্রকল্প অনুমোদনের পরও বাস্তবায়ন হয়নি একটিও। কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ এই উদ্যোগগুলো স্থবির করে রেখেছে এ অঞ্চলের শিল্পায়ন সম্ভাবনা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্যাস সংযোগ না হওয়ায়। এতে যেমন বাড়েনি বিনিয়োগ, তেমনি সৃষ্টি হয়নি কাঙ্খিত কর্মসংস্থানও। বরং রাজনৈতিক দূরদর্শীতার অভাবে খুলনাঞ্চলের পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে শিল্পনগরী খুলনা শিল্পের ঐতিহ্য হারিয়েছে।

সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজার তৈরির দাবি উঠছে বারংবার। অথচ কর্মসংস্থান তৈরির বড় সম্ভাবনা থাকলেও সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক উদ্যোগই থমকে আছে। তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বলছে, উদ্যোক্তাদের জন্য নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনা।

খুলনা বিসিক শিল্প এলাকায় গ্যাস সংযোগের জন্য ব্যবসায়ীদর দাবি বহু বছরের। সে লক্ষ্যে আড়ংঘাটা গ্যাস স্টেশন থেকে বিসিক শিল্প নগরীতে সরাসরি গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২০২৪ সালে। এরপর ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮ কিলোমিটার নতুন পাইপলাইন স্থাপন করে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। গত আগস্টেই কাজ শেষ হয়। কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে গ্যাস সংযোগ হয়নি এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে। পেট্রোবাংলার আপত্তিতে থমকে যায় বহু প্রতীক্ষিত সংযোগ কার্যক্রম।

একদিকে মংলা সমুদ্রবন্দর অন্যদিকে দুই স্থলবন্দর বেনাপোল ও ভোমরা। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ২০১৫ সালে খুলনার বটিয়াঘাটা ও তেরখাদায় দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ। ২০১৭ সালে বটিয়াঘাটার ৫৯৪ একর জমি অধিগ্রহণের অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় জেলা প্রশাসন। জমির উচ্চ মূল্যের কারণে পরবর্তীতে রূপসা ও তেরখাদায় আরও দু’টি জমি বাছাই করা হয়। কিন্তু প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

সূত্রমতে, খুলনা অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক ও নদীকেন্দ্রিক শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলো শুধু স্থানীয় কর্মসংস্থানই নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ব্যাংক ঋণের জটিলতা এবং বাজার সৃষ্টির অভাবে উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। সঠিক নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং নির্ধারিত মার্কেটের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে খুলনা অঞ্চলের অর্থনীতিতে এই খাত নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারবে। এছাড়া দুই বিশ্ববিদ্যালয়, ইকোনোমিক জোন, বিমান বন্দর নির্মাণসহ খুলনাঞ্চলে স্থবির হয়ে আছে অন্তত ১০ প্রকল্প। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতিসহ এ অঞ্চলের সম্ভাবনাগুলোও দেখছে না আলোর মুখ। বাড়ছে না দেশি বিদেশি বিনিয়োগ। দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দাবি আঞ্চলিক নেতাদের। যদিও প্রশাসনের দাবি সব প্রকল্প নিয়েই কাজ চলছে। অপরদিকে, খান জাহান আলী বিমান বন্দরের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ হলেও পিপিপি’র মাধ্যমে প্রকল্প বাতিল হয়েছে।

খুলনা উন্নয়নের অন্যতম রাজপথের যোদ্ধা বিশিষ্ট সমাজকর্মী শেখ আব্দুল হালিম বলেন, টেক্সটাইল মিলের জমিতে পরিকল্পনায় বন্দি থিম পার্ক, প্রস্তাবনায় আটকে যশোর থেকে মংলা পর্যন্ত সড়ক ৬ লেনে উন্নীত করাসহ অন্তত ১০ প্রকল্প। ফলে ব্যাহত হচ্ছে খুলনা অঞ্চলে কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি।

নাগরিক নেতা অধ্যাপক এনায়েত আলী বিশ^াস জানান, দুইটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার জন্য সবকিছু প্রস্তুত হওয়ার পরও অজানা কারণে এটা নিয়ে কারও কোন ভাবনা নেই। খুলনাকে এক সময় শিল্পনগরী বলা হলেও এখন শিল্পের কিছুই নেই। গত তিন দশকে এ অঞ্চল থেকে বিনিয়োগ শুধু কমেছে, নতুন কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়েও ওঠেনি। খুলনার অর্থনীতিকে আবারও আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে অবশ্যই দ্রুত ইকোনমিক জোন করা প্রয়োজন।