অভিশাপ্ত “মে” মাসে আতঙ্কিত উপকুলবাসী

প্রকাশিতঃ মে ৫, ২০২৬, ১০:৪৬

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: মে মাস যেন অভিশাপ্ত মাস উপকুলবাসীর জন্য। বিগত দেড় যুগে উপকুল কাঁপানো বড় বড় ঘুণিঝড় আইলা, মোরা, ফেনী, আম্পান, ইয়াস, সিত্রাং, মোচা আঘাত হেনেছিলো এই মে মাসেই। তাই মে মাস এলেই খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করে। কারণ উপকূলীয় তিন জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ২ হাজার ৬ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৫১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর আগের বছরগুলোতে নিজেদের রক্ষা করতে পারলেও বসতঘর, ফসলি জমি, গবাদি পশু, মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

সূত্রমতে, গত দু’দিনের কালবৈশাখী ঝড়ে চিন্তার ভাজ পড়েছে উপকুলবাসীর কপালে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে চলতি মাসে উপকুলীয়াঞ্চলে একাধিক নি¤œচাপের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সাথে বৃষ্টি, বজ্র বৃষ্টি এবং ঝড় ঝাপটা সম্ভাবনা প্রবল। ফলে অতীত ইতিহাস উপকুলবাসীকে চরমভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। যেহেতু ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা খুলনা উপকূলে আঘাত হেনেছিল। ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরা, ২০১৯ সালের ২ মে ফণী, ২০২০ সালের ১৮ মে আম্পান, ২০২১ সালের ২৬ মে ইয়াস, ২০২২ সালের ৭ মে অশনি একই বছরে সিত্রাং এবং ২০২৩ সালের ১৪ মে মোচা আঘাত হেনেছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’। যা ২৬ মে সন্ধ্যা থেকে ২৭ মে সকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুন্দরবন উপকূল ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। সে হিসাবে প্রতি বছর মে মাসে নিয়মিতভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঁচড়ে পড়ছে উপকূলে। ফলে ঘরবাড়ি ও সবকিছু হারানোর আতঙ্কে থাকেন উপকুলবাসী।

মে মাস আসলেই উপকূলে মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে আম্পাপানের আইলার কথা। আম্পাপানের ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও তার ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়েছে উপকূলবাসীর মনে সেই চিন্তায় মে মাস আসলেই দুশ্চিন্তা বিরাজ করে উপকূলবাসীর মধ্য। চারদিকে নদী ও সুন্দরবন ঘেরা খুলনার উপকূলের মানুষজন একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন। উপকূলের মানুষের কাছে সবচেয়ে ভয়াল মে মাস। তাদের কাছে এটি আতঙ্কের নাম। গত কয়েক বছর যে ঘূর্ণিঝড়গুলো আঘাত হেনেছে, অধিকাংশই মে মাসে। এখন ঘূর্ণিঝড়ের খবর শুনলেই আতঙ্কে দিন কাটে তাদের। প্রতি বছর দুর্যোগের পর নতুন করে ঘর বাঁধেন, বছর না ঘুরতেই আবার ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্ক।

উপকুলের সুন্দরবন বেষ্টিত খুলনার কয়রা উপজেলাটির সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ লঞ্চঘাট থেকে গোবরা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার, হরিণখোলা-ঘাটাখালি এলাকায় এক কিলোমিটার, ৬ নম্বর কয়রা এলাকায় ৬০০ মিটার, ২ নম্বর কয়রা এলাকায় ৫০০ মিটার, মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ি-দশহালিয়া এলাকায় দুই কিলোমিটার, উত্তর বেদকাশি লঞ্চঘাট থেকে গোবরা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার, হরিণখোলা-ঘাটাখালি এলাকায় এক কিলোমিটার, ৬ নম্বর কয়রা এলাকায় ৬০০ মিটার, ২ নম্বর কয়রা এলাকায় ৫০০ মিটার, মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ি-দশহালিয়া এলাকায় দুই কিলোমিটার, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাটকাটা থেকে শাকবাড়িয়া গ্রাম পর্যন্ত এক কিলোমিটার, কাশিরহাটখোলা থেকে কাটমারচর পর্যন্ত ৭০০ মিটার, পাথরখালী এলাকায় ৬০০ মিটার ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শেখেরকোনা, নয়ানি, শাপলা স্কুল, তেঁতুলতলার চর ও চৌকুনি এলাকায় তিন কিলোমিটারের মতো বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এসব এলাকায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীর পানি বাড়লে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের রামপাল, মংলা, মোড়লগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার ভেড়ীবাঁধগুলোর এক তৃতীয়াংশ চরম ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে।

খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের লাখ লাখ উপকুলবাসী ঝড় এলেই তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হন তারা। ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হলেও সর্বনাশ ডেকে আনে জলোচ্ছ্বাস। ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো প্লাবিত হয়ে যায়। প্রতিবার ঘূর্ণিঝড়ে এখানকার মানুষের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এমন পরিস্থিতিতে নিচু জায়গায় উঁচু বাঁধের ও নদীভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানিয়েছেন উপকুলবাসী।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের দাবি, উপকূলীয় ওই তিন জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ অনেকটাই সংস্কার করা হয়েছে। আরও কিছু এলাকা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। বাঁধের যেসব অংশ ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো পর্যবেক্ষণে রেখেছে পাউবো।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস লোনা পানির মৎস্য চাষ কিংবা নদীতে মাছ ধরা। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় এখানকার জনগণ বাধ্য হয়ে এ ধরনের পেশাকে বেছে নিয়েছে। অনেকের কৃষি চাষাবাদযোগ্য জমি থাকার সত্ত্বেও বছরের অধিকাংশ সময় মাটিতে লবণাক্ততার তীব্রতা থাকায় সেখানে ফসল ফলানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তারপরেও অনেকেই বেছে নেয় লবণাক্ত সহনশীল অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন ফসল উৎপাদনের পদ্ধতিকে। উপকূলবর্তী এসব মানুষের অধিকাংশই জীবিকার তাগিদে নিজের জমি বা অন্যের থেকে লিজ নেওয়া জমিতে অক্লান্ত পরিশ্রমে উৎপাদন করে বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, কাঁকড়া, কুঁচিয়াসহ হরেক প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। যেগুলো দেশের বাজারে জনগণের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও বেশ কদর রয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্যে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় এসব মৎস্য সম্পদ বিদেশে রপ্তানি করে প্রতি বছর সরকারি কোষাগারে জমা হয় মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। যার ভিতর দেশের ‘হোয়াইট গোল্ড’ খ্যাত চিংড়ি সবার আগে প্রাধান্য পায়। রপ্তানি বাণিজ্যে বৈদেশিক মুদ্রার একটা সিংহ ভাগ আসে এই চিংড়ি রপ্তানি করে। এছাড়া সম্প্রতি দেশের কাঁকড়া ও কুঁচিয়া বিদেশিদের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। অদূর ভবিষ্যেৎ এটি দেশের রপ্তানি বাণিজ্য খাতে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।