বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: বঙ্গোপসাগর ও নৌরুট পরিবর্তন করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শামুক-ঝিনুক পাচার করছে। ফলে এটি শুধু বনসম্পদ নয়, দেশের সামগ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও চরম হুমকি স্বরূপ।
কয়েকটি অভিযানের পর স্মাগলাররা তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। অবশেষে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এসব স্মাগলাররা সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ নিষিদ্ধ শামুক-ঝিনুক পাচারে নতুন কৌশল হিসেবে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করছে। অবশেষে বনবিভাগ ও পুলিশ সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ শামুক উদ্ধার করেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই অভিযান চালায় তারা।
সূত্রমতে, বন বিভাগ ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে শ্যামনগর পৌরসভার নকিপুর বাজারে ‘সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস’ থেকে এসময় ৫০ বস্তা শামুক-ঝিনুক উদ্ধার করা হয়, যার ওজন প্রায় ২ হাজার ৫শ কেজি। উদ্ধারকৃত এসব শামুক কুরিয়ারের মাধ্যমে কক্সবাজারে পাঠানো হচ্ছিল। সুন্দরবন কুরিয়ারের বুকিং ভাউচারের তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগরের হানজালা নামে এক ব্যক্তি চালানটি বুকিং করেন। ওই বুকিং ভাউচার সূত্রে জানা গেছে, চালানটি কক্সবাজারের নূর আলমের কাছে পাঠানো হচ্ছিল।
পাচারকারীরা শামুকগুলোকে সাধারণ পণ্যের মতো প্লাস্টিকের বস্তায় প্যাকেটজাত করে পাঠায়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো যায়। এ বিষয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শামুক-ঝিনুক পরিবহন নিষিদ্ধ এ তথ্য তাদের জানা ছিল না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সুন্দরবনের গভীর থেকে অবৈধভাবে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ চলছে দেদারছে। প্রতিনিয়ত শত শত কেজি ঝিনুক সংগ্রহ করে পাচার করা হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। পশুর নদীর চ্যানেল দিয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে বাংলাদেশ কলকাতার নৌরুট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ স্মাগলাররা পাচার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বনসংলগ্ন নদী ও খাল থেকে প্রতিদিন ট্রলার ও নৌকায় ভরে শামুক আহরণ করা হচ্ছে। পরে এসব শামুক ট্রাকে সড়কপথে কিংবা ট্রলারে নদীপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অর্থের লোভ দেখিয়ে প্রান্তিক জেলেদের এ কাজে জড়ানো হচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক শ’ মণ শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এর আগেও শ্যামনগরে বনবিভাগের বিশেষ অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কেজি শামুক ও ঝিনুক উদ্ধার করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। বনবিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবন থেকে ধরে নিয়ে এসব ঝিনুক-শামুক পাচার করা হচ্ছিল। উদ্ধার হওয়া এসব ঝিনুক ও শামুক সুন্দরবনের নদীতে অবমুক্ত করা হয়।
শামুক ঝিনুক পাচারে দু’টি সিন্ডিকেট খুব জোরালোভাবে কাজ করছে। একটি গ্রুপ সুন্দরবনের নৌ রুটে স্মাগলিং করছে। অন্য গ্রুপটি সড়ক পথে দালালের মাধ্যমে বস্তায় ভরে পাচারের উদ্দেশ্যে ঢাকা, চিটাগাং কক্সবাজার সহ বিভিন্ন স্থানে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। এক কেজি ঝিনুক বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বিদেশে এর দাম কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় পাচারকারীরা ঝুঁকি নিয়েও প্রতিনিয়ত এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সোসাইটির খুলনা বিভাগীয় চেয়ারম্যান মো: আজগার হোসেন বলেন, এভাবে অবাধে ঝিনুক আহরণ করা হলে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। কারণ ঝিনুক নদী ও খালের পানি পরিশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো হ্রাস পেলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মাছের প্রজনন কমে যাবে।
স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনের নদীখাল যেমন কুনচিখাল, কাললাট, দলদুলির চর, কাঠেশশ্বর, কাইনমারীর চর, সাপখালির চর, পশুরতলা খাল, কৈখালীর মাদার নদী, জয়াখালী খাল, শাকবাড়িয়া নদী, কয়রা নদী ও কপোতাক্ষ নদসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থান হতে ঝিনুক উত্তোলন করে নিয়ে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জলজ প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. তপন কুমার দে বলেন, শামুক ও ঝিনুক নদীর তলদেশের মাটি ও পানির গুণগত মান বজায় রাখে। এগুলো নদীর প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, দূষণ কমায়, মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং মাছ ও কাঁকড়ার খাদ্যচক্র ধরে রাখে। ব্যাপক নিধন হলে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।
কয়রার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী গোবরা গ্রামের মো: আসাদুজ্জামান মৃধা বলেন, জেগে ওঠা বালুচর থেকে দিনরাত শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। ট্রলারে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু ও শামুক একসঙ্গে ওঠানো হয়। পরে পানির ¯্রােতে বালু ধুয়ে ফেলে শুধু শামুক রাখা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দিলে আহরণকারীরা হুমকি দেন।