পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতার বিস্ময়কর প্রতিচ্ছবি ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১১:১৫

আবু জাফর : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সক্ষমতার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পটি বাংলাদেশের স্বাধীন কর্তৃত্বপরায়ণ গণ সার্বভৌমত্বের একটি বড় মাইলফলক। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিতে এই প্রকল্প বিশেষ ভূমিকা রাখবে। রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার সমন্বয়ে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। একই সঙ্গে International Atomic Energy Agency-এর কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ফলে প্রকল্পটি নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে শক্ত অবস্থান অর্জন করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তির অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করেছে। এটি বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কারিগরি সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। এই প্রকল্পে রাশিয়ার প্রযুক্তিতে নির্মিত তৃতীয় প্রজন্মের ৩+প্রযুক্তির VVER-1200 রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে, যা অত্যন্ত নিরাপদ এবং অত্যাধুনিক। দুটি ইউনিটের প্রতিটি ১,২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখবে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মানদণ্ড অনুযায়ী ৫ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ৯৬টি,চীনে ৭৪ টি, রাশিয়ায় ৩৪টি,জাপানে ৩৩টি, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৬টি,ভারতে ২৪টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে।পাকিস্তান বর্তমানে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ১৮-১৯% পূরণ করছে, যা মূলত চীনের সহযোগিতায় করাচি এবং পাঞ্জাবের চাশমা কমপ্লেক্সের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পাকিস্তান ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২৫% বিদ্যুৎ চাহিদা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খান পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রথম উদ্যোগ নেয়। ১৯৬৩ সালে সাইট নির্বাচন ও ১৯৬৮ সালে জমি অধিগ্রহণসহ প্রাথমিক কাজ শুরু হলেও আইয়ুব খানের পতনে তা থমকে যায়।২০০৯ সালে তৎকালীন সেখ হাসিনার সরকার বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে রূপপুর প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেয়।২০১০ সালে রাশিয়ার সাথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০১১ সালে রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে রাশিয়া কর্তৃক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্পের মূল পর্যায়ের কাজের উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম ইউনিটের এবং ২০১৮ সালে দ্বিতীয় ইউনিটের মূল নির্মাণ কাজ কংক্রিট ঢালাই) শুরু হয়।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় আরও সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া থেকে ৯০ শতাংশ ঋণ এবং ১০ শতাংশ বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করছে। ২০২৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে রাশিয়ার ঋণের কিস্তি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলারে পরিশোধ জটিল হওয়ায় বিকল্প হিসেবে রুবল বা অন্য মুদ্রায় পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় আঠাশ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করা হবে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুনিয়া জুড়ে খ্যাতির পাশাপাশি ঝুঁকিও আছে। প্রধান ঝুঁকি হলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের পর যে বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনার অভাব থাকলে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।কোনো কারণে তেজস্ক্রিয়তা লিক হলে মানুষের শরীরে ক্যান্সার, জেনেটিক ত্রুটি এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।যদিও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সাধারণত সুরক্ষিত থাকে, তবুও ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল এবং ২০১১ সালের ফুকুশিমার মতো বড় ধরণের দুর্ঘটনা বা তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ঘটনা ঘটলে তা বিশাল এলাকার পরিবেশ ও মানুষের জীবনের জন্য প্রলয়ঙ্করী হতে পারে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীতলীকরণের জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি প্রয়োজন হবে, যা ব্যবহারের পর গরম পানি জলাশয়ে ফিরে আসবে। এতে জলাশয়ের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং আশেপাশের নদী খাল ও অন্য জলাশয়ের জলজ প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করবে, যা শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি দীর্ঘমেয়াদি উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল প্রায় এক শতাব্দী। জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিকে এগিয়ে গেলো, যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই প্রকল্পের বাস্তব রূপায়ণ বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতা ও দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। এটি শুধু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, বরং এটি উন্নয়ন দর্শনের এক নতুন দিগন্ত। বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, মেধা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা দেশের শিল্পায়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে দেশকে উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।