উপকূলীয়াঞ্চলে কাঁকড়া চাষে চাঙ্গা হচ্ছে উপকূলীয়াঞ্চলের অর্থনীতি

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ০৭:২১

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো: উপকূলীয়াঞ্চলে কাঁকড়া চাষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক বিশাল সম্ভাবনাময় খাত। লবণাক্ত পানিতে কাঁকড়া চাষ অত্যন্ত সফলভাবে হচ্ছে। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাঁকড়া রপ্তানি হয় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে। চলতি বছরে রপ্তানি হয়েছে ৮৬৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকার কাঁকড়া। গত পাঁচ বছরে কাঁকড়া রপ্তানি প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।

সূত্রমতে, আর্থোপোড শ্রেণির শক্ত খোলসবিশিষ্ট এই জলজ প্রাণীটি যদিও স্থানীয়ভাবে খাদ্য হিসেবে তেমন জনপ্রিয় নয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উপকুলের বেকারত্ব নিরাসনে কাঁকড়ার অবদান যথেষ্ট। উপকুল এলাকায় তেমন কোন কর্মসংস্থান না থাকায় নারীরাও ঝুকে পড়েছে এই পেশার সাথে।

রপ্তানি হওয়া মৎস্য সম্পদের মধ্যে চিংড়ির পর সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হচ্ছে কাঁকড়া। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল ৩০৯ কোটি টাকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে কাঁকড়া রপ্তানি প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে সফট সেল কাঁকড়ার চাহিদা বেশি। সফট সেল কাঁকড়ার বাজার মূল্য প্রতি কেজিতে ৮০০ থেকে ১,৪০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং তুলনামূলকভাবে দামি এই সামুদ্রিক পণ্য বিশ্বের অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উপুকলীয়াঞ্চলের চাষীরা বিষয়টি মাথায় রেখে কাকড়া চাষে ঝুঁকে পড়ছে।

সূত্রমতে, চিংড়ির পাশাপাশি গত ৫ বছর ধরে কাঁকড়া রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। রপ্তানি তালিকায় অপ্রচলিত এই পণ্যই বদলে দিচ্ছে লাখো মানুষের ভাগ্য। যে হারে চাহিদা বাড়ছে তাতে ‘সাদাসোনা’ হিসেবে পরিচিত গলদা চিংড়িকে অদূর ভবিষ্যতে হার মানাতে পারে এই জলজ সম্পদ। দেশের পাঁচ উপকূলীয় এলাকায় এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে কাঁকড়ার। মোটাতাজাকরণ ও পোনা পালন প্রকল্পে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় অন্তত শতাধিক কোটি টাকামূল্যের রপ্তানিযোগ্য কাঁকড়া মাটিতেই পড়ে আছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

দায়িত্বশীল সূত্রমতে, বাংলাদেশে কাঁকড়া চাষ প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমান রপ্তানিকৃত কাঁকড়ার প্রায় সবটাই উপকূলীয় চিংড়ি খামার, সমুদ্রের মোহনা, নদী এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থেকে আহরণ করা হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক বা প্রজননক্ষম কাঁকড়ার ওজন সাধারণত ৩০০-৫০০ গ্রাম হয়, যদিও সর্বোচ্চ ৫ কেজি ওজনের কাঁকড়াও পাওয়া গেছে। একটি স্ত্রী কাঁকড়া ১-৮ মিলিয়ন ডিম দিতে পারে। কাঁকড়া দৈহিক বৃদ্ধির জন্য খোলস পরিবর্তন করে এবং এটি মাটিতে ও বাঁধে গর্ত করতে পছন্দ করে, যা ম্যানগ্রোভ এলাকায় এদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে। এছাড়া বর্তমানে হ্যাচারীতে কাকড়া দারুন জনপ্রিয় হয়েছে।

কাঁকড়া চাষের জন্য বাগদা চিংড়ি চাষের ন্যায় উপকূলের লবণাক্ত পানি উপযুক্ত। মাটির গুণাবলির মধ্যে নরম দোঁআশ বা এঁটেল মাটি, হাইড্রোজেন সালফাইট ও অ্যামুনিয়া গ্যাসযুক্ত মাটি, ৭-১২% জৈব পদার্থ এবং অ্যাসিড সালফেটমুক্ত পরিবেশ বাঞ্ছনীয়। পানির ক্ষেত্রে ১০-২৫ পিপিটি লবণাক্ততা, ২৫-৩০ সে. তাপমাত্রা, ৭.৫-৮.৫ পিএইচ, ৮০ মি.গ্রা/লি. অ্যালকালিনিটি, ৪০-১০০ পিপিএম হার্ডনেস এবং ৪ পিপিএমের ঊর্ধ্বে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা উচিত।

উপকুলীয়াঞ্চলের কাঁকড়ার খামারগুলোতে গেলে দেয়া যায়, কাটা হচ্ছে হাজার হাজার তেলাপিয়া মাছ। যা খাঁচাবন্দি কাঁকড়াগুলোর খাবার। আর নিয়ম করে তিনবেলা লক্ষ্য রাখা কাঁকড়াগুলো খোলস পাল্টেছে কিনা। ২০ থেকে ২২দিনের মধ্যেই কাঁকড়ার ওজন বাড়লে কাঁকড়াগুলো রপ্তানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কাঁকড়ার এমন সম্ভাবনা দেখে সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থা যেমন আগ্রহী, তেমনি বর্তমানে চাষিরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন এ খাতে।

মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম বলেন, উপকুলীয়াঞ্চলে চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এটি খুব সম্ভাবনাময় একটি খাত। আমরা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছি, কিছু বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। তবে সমস্যার কথাও জানালেন তিনি। প্রতি বছর পাঁচ মাস সুন্দরবনে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকে এবং এখানে কাঁকড়ার হ্যাচারি নেই। হ্যাচারি হলে সারা বছর উৎপাদন সম্ভব হতো এবং কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকত বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সরকারিভাবে কীভাবে এই বন্ধ সময়েও চাষিদের সহায়তা দেওয়া যায়। বনবিভাগের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। বাগদা বা গলদার পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ আত্মকর্মসংস্থানের বড় মাধ্যম হতে পারে।

কয়রার বাসিন্দা রফিকুল আলম এই চাষে সফলতার মুখ দেখেছেন। তিনি বলেন, “প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে খাঁচায় কাঁকড়া পালন করছি। ভালো লাভ হয়। তবে সমস্যা একটাই পানির সংকট। আর যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো না।” তিনি জানান, একটি বেসরকারি কোম্পানি নদীপথে এসে নির্ধারিত স্থান থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।