জ্বালানি সংকটে নগরজীবন অচল, সড়কে দীর্ঘ যানজট

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ০৯:৩৯

জনতা ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবে দেশে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় রাজধানীসহ সারাদেশে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষ। রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দিন-রাত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। পাম্পমুখী এসব যানবাহনের চাপ মূল সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, যা নগরজীবনকে কার্যত অচল করে তুলছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, জরুরি কাজ ব্যাহত হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা হয়ে উঠছে দুর্বিষহ।

শুক্রবার সরেজমিনে পল্টন, মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকা, তেজগাঁও, মগবাজার, আজিমপুর, নীলক্ষেত, গুলিস্তান ও মতিঝিল ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পের সামনেই দীর্ঘ যানজট। কোথাও কোথাও গাড়ির সারি প্রধান সড়কের একাধিক লেন দখল করে ফেলায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পাম্পে তেল নিতে আসা গাড়ির সারি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
মৎস্য ভবন এলাকার রমনা ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই তেল নিতে আসা গাড়ির সারি পাম্প ছাড়িয়ে শিল্পকলা একাডেমি পেরিয়ে প্রেস ক্লাব হয়ে পল্টন সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এতে সড়কের একটি লেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়ে মৎস্য ভবন, সেগুনবাগিচা, হাইকোর্ট ও পল্টন এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোর সাড়ে ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক গাড়িচালক জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া অনিশ্চিত, উল্টো যানজটে আটকে সময় নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, “সকালে বের হয়েছি কাজের জন্য, কিন্তু তেল নিতে এসে আটকে আছি। কখন তেল পাবো, আদৌ পাবো কি না—তারও নিশ্চয়তা নেই।”
মতিঝিলে মধুমিতা হল সংলগ্ন পেট্রোল পাম্পের সারি ইত্তেফাক মোড় পেরিয়ে গোপীবাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এতে মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে যায়। অফিসগামী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না। অনেককে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হলেও সেখানেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তেজগাঁও থেকে মহাখালী পর্যন্ত একাধিক পাম্পে একই অবস্থা বিরাজ করছে। মহাখালী থেকে মগবাজার মৌচাক ফ্লাইওভার পর্যন্ত দীর্ঘ সময় যানবাহন স্থির হয়ে থাকতে দেখা গেছে। এতে গণপরিবহনেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।
তেজগাঁওয়ের একটি পাম্পে অপেক্ষমাণ এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, সামনে-পেছনে গাড়ির সারিতে আটকা পড়ে নড়াচড়া করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ফ্লাইওভারে আটকে থাকা একটি বাসের চালক জানান, গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, পাম্পগুলো সড়কের মোড়ে হওয়ায় যানজট আরও তীব্র হচ্ছে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের সড়কগুলোতেও।
জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চালকরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে পণ্যমূল্যও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জ্বালানি সরবরাহে টানাপোড়েনের প্রভাব শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়। নারায়ণগঞ্জ, মাগুরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় সরবরাহ সংকটের কারণে পাম্প আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন গ্রাহকরা।
নারায়ণগঞ্জে বেশ কিছু পাম্পে সরবরাহ কমে যাওয়ায় যানবাহনের দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হয়েছে। অনেক চালক রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না। মাগুরায় একই অবস্থা—ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেককে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খাতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও বিঘ্ন ঘটছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিজেলের ঘাটতিতে কৃষি খাতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে বোরো মৌসুমের ফসল হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
ঢাকায় ফুয়েল পাস চালু থাকলেও বাস্তবে এর সুফল পাচ্ছেন না চালকরা। নির্ধারিত পাম্পেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় পাসধারীরাও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে করে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ অবস্থায় পেট্রোল পাম্পকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, “জ্বালানি নিতে পেট্রোল পাম্পের সামনে ও আশপাশের সড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারির কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে এবং পাম্পকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।”
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পাম্পের সামনে অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কেবল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
এদিকে জ্বালানি খাতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) একযোগে সাত কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এই হঠাৎ বদলির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি আনতেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশে সরবরাহ চাপে পড়েছে। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। তারা মনে করছেন, সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা এবং বিকল্প উৎস খোঁজার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবহন, শিল্প ও কৃষি—সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। একই সঙ্গে পাম্প ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নগরজীবনের এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এখন সবার দৃষ্টি সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দিকে। পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।