# তদন্ত থমকে ৫৬ দিন, কৃষকের চরম দুর্ভোগ
# উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বস্তা প্রতি ৩০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
# মিয়ানমারে পাচারে সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট
# ঊর্ধ্বতন নির্দেশনার পরও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি
# প্রভাব খাটিয়ে ১২-১৩ বছর একই কর্মস্থলে বহাল।
কক্সবাজার প্রতিনিধি : কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নে সার পাচার, অনিয়ম ও কৃষি সেবা প্রদানে গাফিলতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের নির্দেশ দিলেও নির্ধারিত সময়ের বহু পরে গিয়েও প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা শুসান্ত দেব পালের ভূমিকা নিয়ে।
সূত্র জানায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক, রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তের নির্দেশ দেন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল—কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের নাম ভাঙিয়ে গর্জনীয়া বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা মালিক হেলাল, মনছুর ও মাহাবুবের সঙ্গে আঁতাত করে মিয়ানমারে সার পাচারে সহযোগিতা, কৃষকদের নিয়মিত সেবা না দেওয়া এবং দায়িত্বে অবহেলা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, রামু থেকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুসান্ত দেব পাল ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামের সহযোগিতায় অবৈধভাবে চোরাই পথ দিয়ে উখিয়ার কাউয়ারকোপ ঘোনা হয়ে গর্জনীয়ার ক্যাজর বিলে সার এনে মজুত করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে টমটমযোগে সার পরিবহন করে বিভিন্ন গুদামে রাখা হয়। এসব গুদামের মধ্যে রয়েছে—হেলালের গুদাম দোছড়ি নাকেল বাগান, মনছুরের গুদাম তিতারপাড়া আল-আমিন মার্কেট এবং মাহাবুবের গুদাম পশ্চিম তিতারপাড়া নতুন মসজিদ সংলগ্ন কাসেম সওদাগরের গুদাম।
প্রতিটি গুদাম থেকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে মিয়ানমারমুখী পাচারকারী সিন্ডিকেট নিয়মিত শত শত বস্তা সার পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে তিনটি সক্রিয় সিন্ডিকেটের তথ্য পাওয়া গেছে—
সিন্ডিকেট (১): কামরুল ইসলাম (ফাকরিকাটা), হাবিবউল্লাহ (পিতা: মোক্তার, দোছড়ি), ছরওয়ার কামাল (পিতা: মৃত অলী আহমদ, ৭নং ওয়ার্ড লেমুছড়ি), আবুলু (পিতা: জহির আলম)।
সিন্ডিকেট (২): শফি আলম (দোছড়ি), ছালাহ উদ্দিন (পিতা: মৃত অলী আহমদ, ৬নং ওয়ার্ড লেমুছড়ি), মোজাম্মেল (পিতা: নজির হোসেন, ৭নং ওয়ার্ড বাহিরমাঠ), ইব্রাহিম (পিতা: এজাহার মিয়া, ৭নং ওয়ার্ড বাহিরমাঠ)।
সিন্ডিকেট (৩): ছুরুত আলম (পিতা: মৃত নুর মোহাম্মদ), ছালামত উল্লাহ (পিতা: জুবাইর, ৭নং ওয়ার্ড বাহিরমাঠ)সহ আরও অনেকে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ।
নির্দেশনায় রামু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুসান্ত দেব পালকে সরেজমিনে তদন্ত করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশনার প্রায় ৫৫-৫৬ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে একই ইউনিয়নে কর্মরত থেকে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী এক কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ না থাকলেও তিনি আত্মীয়স্বজনের প্রভাব এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ১২-১৩ বছর ধরে একই ইউনিয়নে বহাল রয়েছেন।
সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি নতুন রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রছায়ায় অবস্থান ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা সেখানে দায়িত্ব নিতে চান না। তবে অন্য কাউকে সেখানে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, তাকে অন্যত্র বদলি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্নভাবে তা আটকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাটি মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় সার পাচারের ঝুঁকি বেশি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সার পাচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, মিয়ানমারে পাচার হওয়া প্রতিটি বস্তা সার থেকে ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়। কেউ এ বিষয়ে বাধা দিলে তাদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
এক ঘটনায় অভিযোগ রয়েছে, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম তার লোকজন দিয়ে এক কৃষককে আটক করে মারধর করেন এবং তার মোটরসাইকেল আটকে রাখেন। পরে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে মোটরসাইকেলটি ফেরত দেওয়া হয়।
এদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুসান্ত দেব পালের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না এবং সংশ্লিষ্ট অনিয়মে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছেন।
ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। অল্প পরিমাণ সার পেলেও তা নির্ধারিত দামের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং তারা চরম আর্থিক চাপে পড়ছেন।
এছাড়া সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নীতিমালা ও প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে গোপনে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল।