খুলনাঞ্চলে বোরোর বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

প্রকাশিতঃ মে ৪, ২০২৬, ০৯:৪৭

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: বৈশাখী খরতাপে লু-হাওয়ার সঙ্গে সোনালী ধানের শীষে খুলনাঞ্চলের মাঠে মাঠে দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন। বুক ভরা আশা আর ঘাম ঝরানো শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত ধান ঘরে তুলবে, ন্যায্যমূল্য পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যে কাটবে আগামী দিনগুলো এমনটাই আশা তাদের। খুলনাঞ্চলের ২ লাখ ৬৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা এখন ফুলে ফলে সুশোভিত। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধু সোনালী প্রান্তরের মায়াবী হাতছানি।

দেশের দুর্যোগপ্রবণ এলাকা বলে পরিচিত উপকূলীয়াঞ্চলে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎসব আর আনন্দের মধ্য দিয়ে চলছে ধান কেটে ঘরে তোলা। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ফলন ভালো হওয়ায় বেশ খুশি এ অঞ্চলের কৃষকরা।

এ বছর অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত বীজ (ব্রি-১০৮, ব্রি-১০৪, বিনা-২৫) এবং কৃষি প্রণোদনার ফলে খুলনায় বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় জেলাগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার বেশি জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। খুলনা কৃষি অঞ্চলে ২ লাখ ৬৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা আগের বছরের চেয়ে বেশি। ব্রি ধান-২৮, ৭৫, ৮৮, ৮৯, ৯২, ৯৪, ৯৫, ১০০ এবং ১০১, ব্রি-১০৪, এবং বিনাধান-২৫ এর মতো উন্নত জাতের চাষ বাম্পার ফলনে বড় ভূমিকা রেখেছে। সময়মতো চারা রোপণ এবং দুর্যোগের আগে ধান কাটতে পারায় কৃষকরা এবার কাক্সিক্ষত ফলন পেয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ এবং আধুনিক চাষাবাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল জাতের আবাদ হওয়ায় ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

তবে কৃষকরা বলছেন, অনেকের কাছ থেকে ধারদেনা করে বোরা ধান চাষ করি। এ বছর বেশি দামে সার-ডিজেল কেনা ও সেচসহ ধান চাষে এবার অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়েছে তাদের। তারপরেও ধান চাষ করে লাভবান হবে চাষিরা এমনই মন্তব্য কৃষকদের।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সোনালি ধানে দুলছে ফসলের মাঠ। অনেকে ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু করেছে। যাদের জমির ধান এখনো কাটেনি তাদের প্রতিটি গাছের থোকায় থোকায় ঝুলছে ধান। আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন। তবে অনেক এলাকায় পানির জোগান না দিতে পারায় অনেকের রোপা বোরা ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আগামীতে পানির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনার সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত উপকুলীয় উপজেলা কয়রার ৭টি ইউনিয়নে ৫৭২৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এরইমধ্যে বিভিন্ন ইউনিয়নে ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয়েছে। এমন চিত্র খুলনাঞ্চলের সব উপজেলাগুলোতে।

বাগেরহাটের ফলতিতা গ্রামের কিষান আক্কাস আলী বলেন, এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে সারের দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ডিজেলসহ অন্য সামগ্রীর দাম বেশি ছিল। এমনকি ধান রোপণ থেকে কাটা পর্যন্ত শ্রমিকদের মজুরি বেশি। ধান কাটতে একজন শ্রমিককে ৬০০-৭০০ টাকা মজুরি দিতে হয় কিন্তু প্রচ- গরমে বেশি টাকা দিয়েও মুজরি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ধান চাষ করতে যে টাকা খরচ হয়, তা ওঠানো খুব দুরূহ ব্যাপার। তার প্রতি বিঘা জমিতে রুপালি চাষ করে ৩০ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। সে জন্য তিনি ধান চাষ করে লাভবান হবেন।

কৃষক আজাহার রহমান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে বুষ্টি কম হওয়ায় সেচ যন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে পানি দিতে হয়েছে। চারা রোপণে খরচ বেশি হয়েছে। শ্রমিকদের বেশি মজুরি দিতে হয়েছে। সেইসঙ্গে সারও কিনতে হয়েছে বেশি দামে। তারপরেও এ বছর ১ বিঘা জমিতে ২৫ মণ ধান উৎপাদন করতে পেরেছে।

খুলনা জেলা কৃষি অফিসার বলেন, বোরা ধান চাষাবাদে কৃষি অফিসের পক্ষ হতে কৃষকদের পাশে গিয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। বাম্পার ফলনে কৃষক খুশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চাষ বেড়ে যাওয়ায় ফলন বেশি হয়েছে। আশা করি, আবহাওয়া ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে কৃষকরা এবার লাভবান হবেন।

তিনি আরো বলেন, ‘বোরো ধানের সেচ নিয়ে আমাদের কাছে এখনো পর্যন্ত কোনো কৃষক অভিযোগ করেননি। এখন লোডশেডিং হলেও কয়েকদিন আগেও কৃষকরা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সেবা পেয়েছেন। আবার যেখানে ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর সেচ নির্ভর, সেখানে কৃষকরা পর্যাপ্ত ডিজেল পেয়েছেন। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের সমন্বয়ে কৃষক সুবিধা মতো বোরো ধানে সেচ দিতে পেরেছেন।