# ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি করতে সরকারের ১২ কর্মপরিকল্পনা
# দেশে ভারী বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার
# তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা সমাপ্ত হয়েছে
# জলাবদ্ধতা নিরসনে জনসচেতনতা গড়তে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান
# গুচ্ছগ্রাম-৩ পর্যায় প্রকল্প গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে
# অধিবেশন চলাকালে অসুস্থ জামায়াত এমপির খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী
স্টাফ রিপোর্টার
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমানভাবে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার মতে, রাজধানী ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে হলে দেশের সব অঞ্চলে ধাপে ধাপে উন্নয়ন বিস্তৃত করতে হবে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
অধিবেশনে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম রাজধানী ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য করার পাশাপাশি জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানী কেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। চাকরি, চিকিৎসা, শিক্ষা-সব ক্ষেত্রেই রাজধানী কেন্দ্রিকতার কারণে মানুষের ঢাকামুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটি একদিনে হয়নি বরং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে একই মানের সুযোগ-সুবিধা গড়ে তুলতে না পারার কারণেই মানুষ রাজধানীতে আসতে বাধ্য হয়। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পায়ন বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা এবং মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজও ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে। তার ভাষায়, যদি দেশের সব অঞ্চলে সমান সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে রাজধানীমুখী চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। এতে ঢাকার জনসংখ্যা ও যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শুধু রাজধানী নয়, সমগ্র দেশকে সমানভাবে উন্নয়নের আওতায় আনা-এমনটাই জানান তিনি।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকাকে ‘ক্লিন ও গ্রিন সিটি’ করতে ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। রাজধানীকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নাগরিক সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনসমূহ (বর্জ্য ফেলার স্থান) আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ল্যান্ডস্কেপিং, সবুজায়ন সচেতনতামূলক গ্রাফিতি কাজ অন্তর্ভুক্ত করে পরিবেশসম্মতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃক কোরিয়াভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমি ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করার মাধ্যমে সব বর্জ্যকে জিরো বর্জ্যতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করি, এসব কার্যক্রম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা শহর গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার রোড মিডিয়ান, সড়ক দ্বীপ ও উন্মুক্ত স্থানসমূহ সবুজায়নের লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় নগর বনায়ন (মিয়াওয়াকি ফরেস্ট) উন্মুক্ত মিডিয়ান জিরো সয়েল/সবুজে আবৃত করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় আগামী ৫ বছরে ৫ লাখ বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেলের নিচের খালি অংশে (মিরপুর-১২ হতে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত) এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (আব্দুল্লাহপুর হতে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশের) নিচে খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার লিখিত বক্তব্যে জানান, ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সেগুলো হচ্ছে: ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সমন্বিতভাবে আধুনিক বাস সার্ভিস ও ২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার বায়ুদূষণের উল্লেখযোগ্য উৎসসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন, কনস্ট্রাকশন কার্যক্রম ও নির্মাণসামগ্রী দ্বারা বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ রোধে ঢাকার চারদিকে অবস্থিত অবৈধ দূষণকারী ইটভাটাসমূহ বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে ঢাকার সাভার উপজেলাকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড ঘোষণা করা হয়েছে এবং উক্ত এলাকায় ইটভাটার কার্যক্রম পরিচালনা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো ইত্যাদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের নদী, খাল ও জলাশয় দূষণরোধে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অদ্যাবধি ২৪৮টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্থাপিত ইটিপির রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা স্থাপন চলমান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক এরই মধ্যে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ নদীর দূষণের উৎস এবং প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস এবং প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকা শহরকে সবুজে আচ্ছাদিত করা, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন অধিদপ্তর কর্তৃক ঢাকা উত্তর/দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে যৌথভাবে রাস্তার মিডিয়ান, ইউলুপ, পন্ডিং এরিয়া এবং খালের পাড়সমূহে বৃক্ষরোপণ এবং জিরো সয়েল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রজাতির ৪১ হাজার ৫ শত ৬৫টি ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়েছে। ঢাকা শহরের দূষণ কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রজাতির লতা, গুল্ম ও ঘাস দ্বারা মাটি আবৃত করা হয়েছে। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকাকে ক্লিন এবং গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তুলতে বনায়নযোগ্য খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ভারী বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস সরকার সহায়তা দেবে। গতকাল সকালে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। কলিম উদ্দিন জরুরি জন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কৃষকরা মাঠে নেমে কষ্ট করে ধান কাটছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। উত্তরে কলিম উদ্দিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত তিনদিন আগে আবহাওয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আমি সুনামগঞ্জসহ হাওড় অঞ্চলের তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিলাম, আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে বৃষ্টিপাত হলে তারা যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
হাওড় অঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশা ও ক্ষতিকে খুবই বেদনাদায়ক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুধবার সকালে এই সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেও আমি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এসেছি। তাকে নির্দেশনা দিয়ে এসেছি যে হাওড়ের এই তিনটি জেলাসহ ময়মনসিংহের কিছু অঞ্চল প্রবল বর্ষণে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এই এলাকাগুলোতে যে সকল কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের খুঁজে বের করে আগামী তিন মাস সহায়তা দেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে একটি সমীক্ষা সমাপ্ত করেছে। জাতীয় সংসদে গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথা বলেন। সুন্দরগঞ্জের তিস্তা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নদী খননের পরিকল্পনা আছে কি না এবং থাকলে কবে নাগাদ শুরু হবে মাজেদুর রহমানের এ প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তা নদী দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-প্রকৃতিগতভাবে তিস্তা একটি খরস্রোতা নদী। বর্ষা মৌসুমের অতিবৃষ্টিতে এ অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও নদী ভাঙনের ঘটনা ঘটে। পক্ষান্তরে, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে অনেক স্থানে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির সাথে ব্যাপক মাত্রায় পলি প্রবাহের কারণে তিস্তা নদী ভরাট হয় এবং একাধিক চ্যানেলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, এ প্রেক্ষিতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে একটি সমীক্ষা সমাপ্ত করেছে। ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং কাজ বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। যার মধ্যে গাইবান্ধা-১ নির্বাচনী এলাকার তিস্তা নদীর অংশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দাখিলকৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কারিগরি ও আর্থিক বিষয়সমূহ বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাধীন রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম সমাপ্ত এবং কারিগরি দিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক হলে কাজটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
এছাড়াও জলাবদ্ধতা নিরসনে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে সংসদ সদস্যদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সংসদ অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের পয়েন্ট অব অর্ডারে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতায় শহর তলিয়ে যাওয়া এবং নগরবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী এর ওপর বক্তব্য রাখেন। সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকে সংবাদ মাধ্যমে আমিও দেখেছি, অতিবর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম শহরের বেশ একটি বড় অংশ তলিয়ে গেছে, মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। এই সমস্যাটি শুধু চট্টগ্রামে না, বলা যায় সারাদেশেই ছড়িয়ে আছে। ঢাকা শহরে এরকম অনেক জায়গা আছে যেখানে বৃষ্টিতে ড্রেনের পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, পানি আটকে যাচ্ছে ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা অনেক দিনের।’ তিনি বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সমগ্র বাংলাদেশে খাল খননের মাধ্যমে পানির রিজার্ভার তৈরি করেছিলেন। একইভাবে বন্যা বা জলাবদ্ধতাও দূর করেছিলেন। ঠিক একই কাজে আবার ফিরে যেতে হবে আমাদের।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খাল খনন কর্মসূচির কাজটি আমরা শুরু করেছি। শহর অঞ্চলগুলোতে সমস্যা হচ্ছে, এখানকার ভেতরে যে লেকগুলো আছে বা যে বড় নালা, খালগুলো আছে সেগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে প্রবল জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন জিনিস ব্যবহার করি-যেমন প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন এসব ব্যবহার করে আমরা অসচেতনভাবে এগুলো এই খাল-বিলে ফেলে খাল নালার মুখ বন্ধ করে দিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এই ড্রেনগুলোকে ক্লিন করার চেষ্টা করছে। ঢাকা শহরে কয়েকটি করা হয়েছে। কিন্তু সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে গিয়ে আমরা দেখছি যে আবার মানুষজন অসচেতন ভাবে এগুলোতে বিভিন্ন ময়লা ফেলে ব্লক করে দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, এখানে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম আছেন। তার এলাকায় এই সমস্যাটি আছে। তিনি কয়েকদিন আগে আমার সাথে আলাপ করছিলেন এই বিষয়টি নিয়ে। আমি অন্যান্য এলাকায়ও যারা সংসদ সদস্য আছেন তাদের সাথে আলাপ করেছি। এটি একটি বিরাট সমস্যা। আমি মনে করি সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে, আরও নেবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে সকল সংসদ সদস্য উপস্থিত আছেন। আপনাদের সকলের কাছে আমার একটি বিনীত অনুরোধ থাকবে, আসুন আমরা জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করি। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আমরা জনমত তৈরির মাধ্যমে, সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে অনেকাংশেই সমস্যাটির সমাধান করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক বোতল বা পলিথিন বা আরো এই ধরনের যে দ্রব্যগুলো আছে যেগুলোতে ড্রেন বা নালা বা খালগুলো ব্লক হয়ে যায়, এগুলো কিভাবে আমরা ব্যবহার কমাতে পারি অথবা ব্যবহার করার পরে এগুলোকে প্রপারলি কিভাবে ডিসপোজ করতে পারি এই বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আমাদের সংসদ সদস্যদের নৈতিক দায়িত্ব এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতায় জনদুর্ভোগে দু:খ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্যকে বলতে চাই, এরই মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যে মেয়র আছেন ওনার সাথে আমার কথা হয়েছে। উনি এর মধ্যেই চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন অনেক বড় একটা ওয়াটারলগ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে একটু সময় লাগবে। এই কষ্টের জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম শহরে বসবাসকারী সকল নাগরিকের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসার।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘গুচ্ছগ্রাম-৩ পর্যায় প্রকল্প’ গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বুধবার দুপুরে সংসদ অধিবেশনে ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হাফিজ ইব্রাহিমের করা নির্ধারিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা জাতীয় সংসদে এ কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ও অসহায় পরিবারের জন্য টেকসই বাসস্থান এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর।’ তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় ‘আবাসন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র বাংলাদেশে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ও দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসন করা। ২০০১ হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ৬৫ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাহীন এবং প্রাকৃতির দুর্যোগ ও নদীভাঙনের ফলে দুর্গত পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য বর্তমানে ‘গুচ্ছগ্রাম-৩ পর্যায় প্রকল্প’ গ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’ স্বল্প, মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য সুপরিকল্পিত আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং সাশ্রয়ী বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ দেশের জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সুপরিকল্পিত আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় আবাসন সংক্রান্ত প্রকল্প না থাকলেও ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয়তার নিরিখে সম্ভাব্যতা যাচাইপূর্বক এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অপরদিকে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য হাফেজ রবিউল বাশারের খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম পর্ব চলাকালে দুপুরে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে প্রধানমন্ত্রী তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ কথা জানিয়েছেন। তিনি আরো জানান, বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য ও সাতক্ষীরা-৩ আসনের এমপি হাফেজ রবিউল বাশার। পরে অন্যান্য এমপি এবং সংসদ সচিবালয়ের কর্মীদের সহায়তায় তাঁকে অধিবেশন কক্ষ থেকে লবিতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। এরপর জোহরের নামাজের বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ লবিতে গিয়ে অসুস্থ এমপি বাশারের শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেন। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তার বিষয়ে নির্দেশনাও দেন। এ সময় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপসহ অন্য হুইপগণও উপস্থিত ছিলেন।