শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০১:৫৫

স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসুর একাধিক নেতার ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। একই দিনে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষ ও হামলার অভিযোগ সামনে আসায় সামগ্রিকভাবে শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা ও সহাবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার ওপর হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারধরের ঘটনা ঘটে, যাতে একাধিক ছাত্রনেতা আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। একটি পক্ষের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুয়া পরিচয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী তা অস্বীকার করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। নিরাপত্তা উদ্বেগে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে তা গ্রহণে বিলম্ব ও জটিলতা সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় বিষয়টি মীমাংসার জন্য ডাকসুর নেতারা থানায় গেলে সেখানে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে এবং হামলার ঘটনা ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ অভিযোগ করেছেন, থানার ভেতরে ঢুকে সংগঠিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে এবং এ সময় পুলিশ কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে এ ধরনের আচরণ শিক্ষাঙ্গনের জন্য অশুভ বার্তা বহন করে। তিনি ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
ডাকসুর সহ-সভাপতি সাদিক কায়েম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি সকল ছাত্রসংগঠনকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মতবিরোধ থাকলেও তা সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত নয়। একইসঙ্গে তিনি প্রশাসনের কাছে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও মহল থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শাহবাগ থানার ভেতরে হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তিনি শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা পরিহার এবং সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার সময় থানার ভেতরে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেননি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন একটি সংবেদনশীল স্থানে—যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকার কথা—সেখানে সহিংসতা ঘটার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
একই দিনে দেশের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সহিংসতার অভিযোগ সামনে এসেছে। পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। এতে কয়েকজন আহত হন। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, মিছিল চলাকালে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটেও বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, একই দিনে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তারা বলছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তা সহিংসতায় রূপ নেওয়া উদ্বেগজনক প্রবণতা।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, শিক্ষাঙ্গন হওয়া উচিত মতবিনিময় ও জ্ঞানচর্চার নিরাপদ স্থান। সেখানে সহিংসতা বা শক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এজন্য সব পক্ষকে সংযম দেখানোর পাশাপাশি প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
এদিকে, ঘটনার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা প্রতিরোধে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা। অন্যথায় এ ধরনের উত্তেজনা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।