বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: রাজনৈতিক শেল্টারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাদক ব্যবসায়ীরা অধরা। ফুলে ফেঁপে উঠেছে সিন্ডিকেট চক্র। সীমান্তের ১৩টি ঘাট মাদক চোরাচালানের জন্য এখন উন্মুক্ত রুট। মাদকের টাকায় কেনা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র, যানবাহন। গড়ে তুলছে প্রাসাদ, হাতিয়ে নিচ্ছে রাজনৈতিক পদ-পদবী এবং স্থানীয়ভাবে প্রতাপ প্রতিপত্তি। প্রতিমাসে শত শত কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে তালিকাভুক্ত ১৩৭ শীর্ষ মাদক চোরাকারবারী বানের পানির মত মাদক ঢুকাচ্ছে এ অঞ্চলে। আর এখানে “ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সরদারের” মতই দশা নারকোটিক্স বিভাগের।
মাদকের মধ্যে ফেনসিডিল এবং ইয়াবা হচ্ছে সেবনকারীদের মধ্যে হটকেক। কিশোর তরুন যুবক আর নানা শ্রেনী পেশার মানুষেরা মাদক সেবনে এখন শীর্ষে। রয়েছে মাদক কেনাবেচায় রাজনৈতিক ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যক্তি বিশেষের স্পেশাল সেল্টার। আর মাদকের রুট দখল, সীমান্তে পাচার নিয়ে মতানৈক্য এবং ভাগ বাটোয়ারায় খুন খারাপিতে জড়িয়ে পড়ছে গডফাদাররা। এসব কানেকশনে আন্ডারওয়ার্ল্ড সক্রিয় হয়ে উঠছে। যে কারণে গত ১৬ মাসে খুলনাঞ্চলে অর্ধ শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২ শতাধিক। অবশেষে পুলিশের টনক নড়লেও কোনভাবেই সামাল দিতে পারছে না মাদক ব্যবসায়ী ও আন্ডারওয়ার্ল্ড।
সূত্রমতে, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় শীর্ষ মাদক চোরকারবারির ১২৪ জন পুরুষ ও মহিলা মিলে রয়েছে ১৩৭ জন। তালিকাভুক্তির বাইরে রয়েছে আরও শতাধিক শীর্ষ ও মাঝারি মাদক ব্যবসায়ী। কয়েক হাজার রয়েছে স্থানীয় ডিলার। এ সব শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা নিজেদের বাহিনীদের দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাদকদ্রব্য বহনের ক্ষেত্রে অনেক সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও ব্যবহার করা হয়। পণ্যবাহী গাড়ি, পিকআপ, ট্রাক, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নানাভাবে খুলনায় আসছে মাদকের চালান। পুলিশ, র্যাব ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুলনার বিভাগের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ মাদকদ্রব্যের বড় বড় চালান ধরে। মাদকবহণকারীরা গ্রেফতার হলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় গডফাদাররা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক হারে মাদক ঢুকছে। মাদকাসক্ত তরুণদের মধ্যে শিক্ষিতের হারই বেশি। অনেকে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে যাচ্ছে। দেশের সর্বত্র মাদক এখন অনেকটা সহজলভ্য। শহর-নগর, গ্রামসহ মফস্বল এলাকায়ও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, আফিম, চরশ, বাংলা মদ, গুল, মরফিন, কোকেন, এলএসডি, চোলাইমদসহ রকমারি মাদকের সঙ্গে তরুণদের সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার ভোমরা স্থল বন্দরের সন্নিকট এলাকা, দেবহাটা ও কালীগঞ্জ উপজেলার ৭টি ঘাট যা ইছামতি নদীদ্বারা ভারত বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছে এবং কলারোয়া উপজেলার ৬টি ঘাট দিয়ে প্রতিদিন মাদক আসছে। নৌকায় করে, ভেলায় ভেসে, ট্রলারে আবার কখনও নদী সাতরীয়ে মাদক পাচার হয়ে থাকে। সীমান্ত এবং কেএমপি খুলনাসহ বেশ কয়েকটি থানার কতিপয় অসৎ পুলিশ কর্মকর্তা এর সাথে জড়িত। একটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ মাদক কারবারীর তালিকায় দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় শীর্ষ মাদক চোরাকারবারী রয়েছে ১৩৭ জন। এর মধ্যে খুলনায় ৯ জন, যশোরে ২০ জন, সাতক্ষীরায় ৪ জন, বাগেরহাটে ২৬ জন, ঝিনাইদহে ৭ জন, নড়াইলে ২১ জন, মেহেরপুরে ১১ জন, চুয়াডাঙ্গায় ১০ জন, কুষ্টিয়ায় ৮ জন এবং মাগুরায় ২১ জন। এসব শীর্ষ মাদক চোরাকারবারীদের মধ্যে মহিলারা রয়েছে ১৩ জন। তবে মাঠ পর্যায়ে রয়েছে এদের বিশাল নেটওয়ার্ক। সেই তালিকায় স্থানীয় গডফাদারদের সংখ্যা ৫ শতাধিক।
খুলনা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিমাসে অভিযান হচ্ছে আসামী গ্রেফতার হচ্ছে এবং চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। ২৬ লাখের বেশি জনসংখ্যার নগরী খুলনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসে রয়েছে মাত্র দুটি গাড়ি। ফলে চরম বিড়ম্বনা ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলছে এই দপ্তর এবং অধীন দুটি সার্কেলের অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম। এ ছাড়াও দপ্তরটিতে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদ রয়েছে শূন্য।
কেএমপি ডিসি নর্থ তাজুল ইসলাম বলেন, মাদকের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাই এখন অপরাধ প্রবনতায় জড়িত। বলতে দ্বিধা নেই খুলনায় মাদকের বেচা কেনা হলেও পুলিশ সব সময় সজাগ রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চলছে। আশা করি নতুন পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে আমরা খুলনাকে মাদকমুক্ত করতে পারবো ইনশাল্লাহ।
মুক্তি সেবা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আফরোজা আক্তার মঞ্জু বলেন, আমাদের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এতেই প্রমান করে সমাজে মাদকের ভয়াবহতা বাড়ছে। তিনি এ ব্যাপারে নাগরিক সমাজকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।