বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: উপকূলীয়াঞ্চালের লবণাক্ততার আগ্রাসনের মধ্যে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষে ঘুরে দাঁড়িয়েছে চাষিরা। জলবায়ু পরিবর্তনে এবং একের পর এক সাইক্লোনে লন্ডভন্ড কৃষি ক্ষেতে লোকসান পোষাতে চাষিরা মৎস্য চাষের পাশাপাশি সবজি চাষে সফলতা এনেছে। এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে সমন্বিত চাষের ফসল সবজি রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য সহ ইউরোপের বাজারে। এসব সবজি বাজারে বিক্রি করে আসছে প্রান্তিক কৃষকের অতিরিক্ত অর্থ। ফলে তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ছে। চলতি মৌসুমে ২৭ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৬৫৪ টনেরও বেশি সবজি উৎপাদন হয়েছে। যা প্রতি হেক্টর জমিতে ২৩.৫৩ টন।
মাছ চাষের পাশাপাশি সমন্বিত সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছে উপকূলের কৃষকরা। মৎস্য ঘের পাড়ে যে সব জমি পতিত থাকতো সে সব জমিতে উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন জাতের সবজি। ফসলি জমি ছাড়া ঘেরের বেড়ি ও পতিত জমিতে বাঁশ দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি মাচাতে ঝুলছে শসা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, উচ্ছে, ঝিঙে, বরবটি, পুঁইশাক, খিরাইসহ নানা রকমের সবজি।
সূত্রমতে, উপকুল অঞ্চলের খুলনা জেলায় ৮ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে ১৭ লাখ ৬ হাজার ২২২ টন সবজির ফলন হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ২১.১৪ টন ফসল। বাগেরহাটে ৯ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৫১ হাজার ২৫২ টন ফসল, প্রতি হেক্টরে ২৭.৩১ টন ফসল। সাতক্ষীরায় ৯ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ১৩ হাজার ১৮০ টন ফসল, প্রতি হেক্টরে ২২.০ টন ফসল।
কৃষি বিভাগ খুলনা জোনের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে খুলনা কৃষি অঞ্চলে সবজি উৎপাদনের মূল্য প্রায় ২ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। এতে গড়ে প্রতি কেজি সবজির দাম ৪০ টাকা। খুলনা সাতক্ষীরা বাগেরহাটের উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ইতালি, ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়ায়ও রপ্তানি করা হয়। এবার ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।
মরুদ্দ্যানে ফসল ফলানোর মতই লবণাক্ত জমিতে সবজি চাষে ভাগ্য বদলেছে উপকুলীয়াঞ্চলের কৃষকরা। এটা বিশাল কর্মযজ্ঞ না হলেও জীবন জীবিকার সন্ধিক্ষনে এ এক অন্যরকম দিন বদলের কর্মযজ্ঞ। মান্ধাতা আমলের কৃষি কাজ এখন সুদূর পরাহত। মৎস্য ঘেরের পরিত্যক্ত জায়গায় উচ্চফলনশীল বা হাইব্রিড সবজি চাষাবাদ এখন বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। স্বল্প সময়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশকে চ্যালেঞ্জ করে চাষাবাদ এখন সময়ের সেরা গল্প। প্রতিকুল আবহাওয়াকে মোকাবেলা করে খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের কৃষকরা তাই সেই সাফল্যের গল্পকে বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে। হাটি হাটি পাঁ পাঁ করে জীবনকে করছে আলোকিত। আর প্রানন্ত চেষ্টা চলছে ভবিষ্যতে আরো শক্তভাবে ঘুরে দাড়ানোর। তাই মৎস্য ও সবজি সমন্বিত চাষ খুলনাঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। লবনাক্ত এলাকার গ্রামে গ্রামে এই সমন্বিত পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকরা এখন এ পদ্ধতিতে চাষ করছেন। উপকূলীয়াঞ্চলে এটা একটা আশারবানী। কৃষি ক্ষেত্রে এ এক নতুন অগ্রযাত্রা। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও এ যেন কৃষি বিপ্লবেরই স্বাক্ষর বহন করছে।
খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা মুলত উপকুলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। চিংড়ি চাষ করে গত ২ যুগে এ অঞ্চলের মানুষ বিশেষ সফলতা লাভ করে। কিন্তু গত অর্ধযুগে এ অঞ্চলের চিংড়ি চাষীরা ভাইরাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ শিল্পে লোকসান গোনে। তাছাড়া লবণাক্ততা নিয়ে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হয়ে ওঠে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ সমন্বিত রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন এনজিও ও সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিত চাষের ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ফলে মৎস্য চাষীরা ঝুকে পড়ে সমন্বিত সবজি চাষে। আর এই সবজি চাষই এখন এ অঞ্চলের চাষীদের অন্যতম জীবিকার উৎস।
খুলনার দাকোপের বাজুয়ায় দেখা যায়, প্রায় একশ’ বিঘা জমিতে মাছ চাষের পাশাপাশি জলাশয়ের পাড়ের উপর দিয়ে বিভিন্ন সবজির বাগান রয়েছে। সেখানের মাচায় ঝুলছে শশা, চিচিঙ্গা, লাউ ও কুমড়া। আর পাড়ের উপর রয়েছে ঢেড়শ, বরবটি ও বিভিন্ন শাক। অর্ধশতাধিক চাষি খন্ড খন্ড করে তাদের লবণাক্ত জমি খনন করে একদিকে মৎস্য চাষ করছেন, অন্যদিকে পাড়ের উপর বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন।
ডুমুরিয়া থুকড়া গ্রামের মাদরাসা শিক্ষক ও সমন্বিত চাষের অন্যতম উদ্যোক্তা আবুল কাশেম জানান, শিক্ষকতার পাশাপাশি আমার দু’টি মাছের ঘের রয়েছে। ঘেরের অনাবাদি জমিগুলো এতোদিন পরে থাকতো। সেখানে শুরু করেছি সবজি আবাদ। সমন্বিত চাষে মাছ ও সবজি দুটোই ভালো হচ্ছে। সবজি বিক্রি করা টাকা জমিয়ে আমি ছেলের বিবাহর খরচ নির্বাহ করেছি।