ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় মাইল ফলক

প্রকাশিতঃ মে ২, ২০২৬, ১৬:১৪

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র শ্রমিক ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা টানা ১০ দিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় উৎপাদনে যাওয়ায় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ সংকট লাঘব হয়েছে। গত কয়েক দিনের খুলনাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা শিল্প কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত সহ জন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। অবশেষে সরকারের হস্তক্ষেপে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করায় জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। গেল বছর ডিসেম্বর মাসে ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সর্বোচ্চ ৬ শ’ ৪০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রেকর্ড করেছিল। ফলে কেন্দ্রটি তখন দ্বিতীয়বারের মত জাতীয় গ্রীডে উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকার করে। মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার কোম্পানীটি দেশের মোট ৫ হাজার ৫শ’ ৩১ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১১.৫ শতাংশ সরবরাহ করছে। যা রেকর্ড করা একটি বড় সাফল্য।

সূত্রমতে, অনেকটা বিরোধীতার মধ্যদিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি। রাজনীতির বেড়াজালে পড়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকটা জটিল পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল। যাকে অনেকটা অতিক্রম করে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখে। বাগেরহাট জেলার রামপালে অবস্থিত কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। রামপালে ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের রাষ্ঠ্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (ইচউই) ১৩২০ মেগওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প এটি। বিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মিত হয়েছে সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে। সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে পশুর নদী ঘেঁষে এই প্রকল্পের ১৮৩৪ একর জমির সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১০ সালে জমি অধিগ্রহণ করে বালু ভরাটের মাধ্যমে এই বৃহৎকর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৯ জানুয়ারী ২০১২ তারিখে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এনটিপিসির সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। যৌথ উদ্যোগের এই কোম্পানিটি বাংলাদেশ ভারত ফেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআই এফপিসি) নামে পরিচিত।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তারা উচ্চমানের কয়লা আমদানি করে ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনি তৈরি করেছে পরিবেশ রক্ষায়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সুন্দরবনের উপর প্রভাব নগণ্য পর্যায়ে রাখার জন্য অন্যন্য পদক্ষেপ নিয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে কর্মস্থানের দিকে নিয়মিত লক্ষ্য রাখা হচ্ছে যা স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনেতিক সমৃদ্ধি আনয়নে সযোগিতা করছে।

২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট থেকে সক্ষমতার সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এদিকে বিএনপি সরকার গঠনের পর বিদ্যুৎখাতে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। শ্রমিক ও জ্বালানি সংকট থাকায় বৃহৎ এই তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যায়।

জাতীয় গ্রীডে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্পায়নে অবদান রাখছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। দেশের জাতীয় গ্রিডে যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যুৎ যোগ করছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকেও গতিশীল করছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট থেকে দিনের বেলা ৪০০ থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। আর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত চাহিদা থাকে ৬০০ থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সোসাইটির খুলনা বিভাগীয় চেয়ারম্যান আজগর হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে মজুদ সক্ষমতা বাড়িয়ে সব সময় চার থেকে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন কয়লা মজুদ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সময় কয়লা ক্রয়ের মূল্য বকেয়া থাকে কিন্তু এটা স্বাভাবিক তারপরও কর্তৃপক্ষ নিজেদের দক্ষতার বলে কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে কোন বাঁধা না আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উত্তোলন ১৭০০ মিরিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। বাড়তি এল এন জি আমদানি করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। দৈনিক ঘাটতি ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সরবরাহ নিয়মিত না থাকলে উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্পায়নে অবদান রাখছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। দেশের জাতীয় গ্রিডে যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যুৎ যোগ করছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকেও গতিশীল করছে। স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের সুবিধা এবং নারী ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কার্জক্রমও বেশ ভালোভাবে করে যাচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি।

এ বিষয়ে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, এ পর্যন্ত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১০ হাজার ৩৫৯ বিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। আর প্রতি মাসে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রায় দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৭ থেকে ৮ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত কয়লা থাকলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহে কোন বাধা থাকবে না। ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে।