হাইপারসনিক-ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে অরক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১৪:৩৫

জনতা ডেস্ক: রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে থাকা হাইপারসনিক অস্ত্র কিংবা উন্নত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নেই বলে স্বীকার করেছেন পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে দেশটির মহাকাশ যুদ্ধ নীতি বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মার্ক বারকোভিচ সিনেটে ওই তথ্য জানিয়েছেন।তিনি বলেছেন, প্রতিপক্ষ দেশগুলো বর্তমানে হাইপারসনিক এবং দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ এমন সব ‘নন-ব্যালিস্টিক’ হুমকি তৈরি করছে; যা সরাসরি ‘আমাদের মাতৃভূমিকে ঝুঁকিতে’ ফেলছে।যুক্তরাষ্ট্রে নির্মাণাধীন পরবর্তী প্রজন্মের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংক্রান্ত শুনানিতে মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির সামনে বারকোভিচ এসব কথা বলেন।যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মার্ক বারকোভিচ বলেন, ‘‘বর্তমানে আমাদের কেবল ভূমি-ভিত্তিক একটি সীমিত ও একস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে; যা মূলত উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর ছোট আকারের আকস্মিক হামলা ঠেকানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।’’তিনি বলেন, ‘‘অন্য যেকোনও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। আর উন্নত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা হাইপারসনিক অস্ত্রের কথা বললে—তা ঠেকানোর মতো কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের হাতে আজ নেই।’’


চীন, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর মূল্যায়ন সিনেটে তুলে ধরেছেন বারকোভিচ। যা ওয়াশিংটনকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় ধরনের ঘাটতি স্বীকার করে নিতে বাধ্য করেছে।


এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি ব্যাপকভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ঢাল তৈরির পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। প্রায় ১৭৫ থেকে ১৮৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রস্তাবিত সিস্টেমে এআই-চালিত কমান্ড সিস্টেম এবং স্থল, সমুদ্র, আকাশ ও মহাকাশজুড়ে ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ব্যবস্থা সমন্বিত করা হবে।


প্রথাগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ সব ধরনের আকাশপথের হুমকি থেকে পুরো দেশকে সুরক্ষা দিতে এতে মহাকাশ-ভিত্তিক সেন্সরসহ উদীয়মান প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
ট্রাম্পের গোল্ডেন ডোম বিষয়ক জার ও স্পেস ফোর্সের প্রধান জেনারেল মাইকেল গুয়েটলেইন বলেছেন, ২০২৮ সালের মধ্যে গোল্ডেন ডোমের কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য প্রাথমিক পর্যায়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল চাওয়া হয়েছে। ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত এই কর্মসূচির সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮৫ বিলিয়ন ডলার।
শুনানিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের গভীর কাঠামোগত সমস্যাও ফুটে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থার পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিথ এ কলিন্স বলেছেন, বছরের পর বছর বিনিয়োগের অভাবে দেশ বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতিতে রয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর তৈরি এবং দীর্ঘস্থায়ী তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যবস্থা কিংবা সাপ্লাই চেইন বড় করতে সময় লাগবে।


ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার কথাও সিনেটে তুলে ধরেছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। সেসব যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যবহার অনেক সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছে। কর্মকর্তারা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বা ‘ম্যাগাজিন ডেপথ’ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
বড় অংকের ব্যয় আর এই প্রকল্পের অর্থায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। দেশটির সিনেটর অ্যাঙ্গাস কিং প্রচলিত বরাদ্দের বাইরে অন্য উপায়ে তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি একে একটি ‘বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন। অ্যাঙ্গাস কিং বলেছেন, এর ফলে এই প্রকল্পের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি কমে যাবে।
পারমাণবিক প্রতিরোধের পুরোনো তত্ত্ব এখনও যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন তিনি। জবাবে বারকোভিচ বলেন, বর্তমান কৌশলগত পরিবেশ স্নায়ুযুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি জটিল। কারণ এখন উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা সম্পন্ন একাধিক পারমাণবিক প্রতিদ্বন্দ্বীর উপস্থিতি রয়েছে।


তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিরোধের নীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং প্রতিরোধের নীতি ব্যর্থ হলে নাগরিকদের সুরক্ষায় ‘তলোয়ার ও ঢাল’ উভয় হিসেবেই কাজ করবে এই ব্যবস্থা।

সূত্র: এনডিটিভি।