উপকুলীয়ঞ্চলে অবাধে পোনা আহরণ হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০৭:৫৩

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার খ্যাত সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয়ঞ্চলের নদ-নদী ক্রমেই প্রজনন ক্ষমতা হারাচ্ছে। অবাধে চিংড়ি পোনা আহরণে এ খাতে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ছে। উপকূলরেখা ও নদীর মোহনায় লাখ লাখ নারী-পুরুষ ও শিশু নিñিদ্র টানা বা বেহুন্দী জাল দিয়ে চিংড়ির পোনা ধরছেন। এতে চিংড়ির সঙ্গে নানা জাতের মাছের পোনা ও সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভাও মারা পড়ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য।

সূত্রমতে, উপকুলীয়ঞ্চলের খুলনা বাগেরহাট সাতক্ষীরা এলাকার ঘের মালিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় চিংড়ির রেণু কেনাবেচায় গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের ছত্রছায়ায় নদী তীরের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ চিংড়ির রেণু আহরণকে মৌসুমি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। অথচ বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এতে দক্ষিণ উপকূলের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। সুন্দরবন ও সাগরকে ঘিরে রয়েছে অর্থনীতির অফুরন্ত সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাপী ‘ব্লু-ইকোনমি’ এখন উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। মৎস্যসম্পদ, নৌপথ, পর্যটন, খনিজ সব মিলে এ সাগরকে করেছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক বিশাল ভান্ডার। উপকুলের লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ সম্পদ আহরণের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে উপকূলের জেলেদের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরার ওপর।

প্রতি বছর সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসছে ছোট পোনা ধরা থেকে। অথচ এ পোনা বড় হতে না হতেই নিষিদ্ধ জালে নিধন হচ্ছে। শুধু মাছ নয়; কাঁকড়া, ডলফিন, সামুদ্রিক কাছিম, সাপ, পোকামাকড়, শৈবাল, প্রবাল কিংবা অন্যান্য বিরল প্রাণীও আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে।

সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরা উপকূলের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। নদীতে ভেসে আসা ‘হোয়াইট গোল্ড’ খ্যাত বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এ উপকূলের মানুষ। তবে রেণু পোনা আহরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ আইনত নিষিদ্ধ আছে। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞার কথা জেনেও তারা এসব রেণু পোনা ধরেন।

উপকুলের এলাকা জুড়ে বিস্তীর্ন নদ-নদীতে শিশুসহ অসংখ্য নারী-পুরুষ প্রতিদিন লাখ লাখ চিংড়ির রেণু ধরছে। শুধু রাতে নয়, দিনেও অবৈধ এই কাজ চলে। সুন্দরবন সংলগ্ন উপকুলের সবগুলো বড় নদনদীতে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় দুই বছর জেল-জরিমানার বিধান রেখে চিংড়ির রেণু আহরণ এবং কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। তবে সেটি কাগুজে আইনে পরিণত হয়েছে। এই অবৈধ কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এক শ্রেনির পুলিশ ও বন বিভাগ। ফড়িয়াদের মাধ্যমে সাপ্তাহিক চুক্তিতে তারা উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে এই অনৈতিক কাজকে আরও বেগবান করে তুলছে। মাঝে মাঝে কোষ্টগার্ড, নেভী ও মৎস্য অধিদপ্তর আকষ্মিকভাবে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ফেলে। মাঝে মাঝে জমিরমানাও করে। কিন্তু আবারও অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলতে থাকে পোনা নিধন।

সিনিয়ম মৎস্য কর্মকর্তা প্রফুল্ল কুমার রায় বলেন, একটি চিংড়ির রেণু আহরণের বিপরীতে অন্য প্রজাতির মাছের অন্তত ২ হাজার রেণু ধ্বংস করা হচ্ছে। রেণু আহরণকারীরা কেউ পেশাদার জেলে নন। উপকূলের অতিদরিদ্রদের একটি অংশ এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। আমাদের মিঠাপানিতে ২৪৭ প্রজাতির মাছ রয়েছে। চিংড়ির রেণু আহরণে শতাধিক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মাত্র ৫০ টাকার মশারি জাল দিয়ে চিংড়ির রেণু ধরার নামে মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সোসাইটির খুলনা বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. সোহেল রানা। তিনি বলেন, রেণু আহরণে একটি মাফিয়া চক্র গড়ে উঠেছে। দক্ষিণের নদনদী থেকে আহরিত রেণু পাচার হয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট এলাকায়। সেখানকার ঘের মালিকরা দালাল চক্রের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় অর্থ বিনিয়োগ করেন। দালালরা আহরণকারীদের কাছ থেকে প্রতিটি রেণু দেড় টাকায় কেনেন। এরপর তারা স্থানীয় আড়তদারদের কাছে তা আড়াই টাকায় বিক্রি করেন। আড়তদাররা সড়কপথে খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ঘের মালিকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে প্রতিটি রেণুর জন্য পান ৪ টাকা।

অধ্যাপক ও মৎস্য বিজ্ঞানী ড. ইয়ামিন বলেন, জানুয়ারি – ফেব্রুয়ারিতে চিংড়ি মাছ ডিম ছাড়ে। ডিম থেকে লার্ভার জন্ম হয়। তাই প্রতি বছর লার্ভা আহরণ করে উপকূলের অতিদরিদ্র শ্রেণির কিছু মানুষ। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি। তিনি আরও বলেন, চিংড়ির একটি লার্ভা আহরণ করতে গিয়ে অন্য প্রজাতির শত শত লার্ভা ধ্বংস করা হচ্ছে। আইন করে দরিদ্রদের লার্ভা সংগ্রহে বিরত রাখা যাবে না। বরং তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত- কীভাবে শুধু চিংড়ির লার্ভা সংগ্রহ করা যায়। এবং তাদের অন্য পেশায় পুর্নবাসন করতে হবে।