বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চুইঝাল চাষ কৃষকদের জন্য এক নতুন আশার আলো। ধীরে ধীরে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাচ্ছে। ভেষজগুন সম্পন্ন এই চুইঝাল দেশের বাজার ছাপিয়ে বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছে কৃষক। স্বল্প দিনে অতি জনপ্রিয় চুইঝাল এখন রসনাবিলাসদের খাদ্য তালিকায় আনপ্যারালাল। খুলনাঞ্চলের উৎপাদিত চুই এখন রাজধানী সহ দেশের সর্বত্র সাড়া ফেলে দিয়েছে।
বাড়ির আনাচে কানাচে অযতœ অবহেলায় পরজীবীর মত চুইঝাল একসময় আপন মহিমায় বেড়ে উঠতো। এখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চুই ঝাল চাষে দারুন সাফল্য এসেছে। বাণিজ্যিকভাবে রীতিমত তাক লাগিয়ে দিয়েছে। চুইলতার শিকড়, কান্ড, পাতা, ফুল-ফল সবই ভেষজগুণ সম্পন্ন। ক্যান্সার, হৃদরোগ, গায়ে ব্যথা, ক্ষুধামন্দা, গ্যাস্ট্রিক ও এ্যাজমাসহ অসংখ্য রোগের প্রতিষেধক হিসেবে চুইঝাল খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এটি একটি ঔষধি গুণাগুণ সম্পন্ন মসলা জাতীয় খাবার। দিন দিন ভোজন বিলাসীদের কাছে এর কদর বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন গোশতে চুইঝালের সংমিশ্রনের জুড়ি মেলা ভার। চাহিদা বাড়ার ফলে বেড়েছে বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ। দুই প্রকার চুই দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত বেশি জনপ্রিয়। একটি হচ্ছে গেছো চুই অপরটি হচ্ছে ঝাড় বা ঝুটা চুই। গেছো চুই আম জাম বা কচা গাছ সহ যে কোন বড় গাছে পেচিয়ে পেচিয়ে উঠে যায়। চাষিরা ঐগাছ থেকে চুইঝালের বিভিন্ন অংশ কেটে কেটে বিক্রি করে। অবশেষে গোড়া খুচে চুইঝালের শিকড় উঠিয়ে নিয়ে বাজারজাত করে। অন্যজাতের চুইঝাল মাটিতে ঝুঠা বা ঝাকড়া হয়ে থাকে।
এই উদ্ভিদের শিকড় থেকে শুরু করে প্রতিটি অংশই ভেষজ ক্ষমতাসম্পন্ন। তাছাড়া এই উদ্ভিদে আইসোফ্লাভোন, অ্যালকালয়েড, পিপালারিটিন, পোপিরন, পোলার্টিন, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, সিজামিন, পিপলাস্টেরল থাকে। এসব উপাদানের সঙ্গে থাকা অন্যান্য উপাদান ক্যানসার, হৃদরোগ, শরীর ব্যথা, ক্ষুধামন্দা, গ্যাস্ট্রিক, অ্যাজমা, অনিদ্রাসহ অসংখ্য রোগের প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে। তাছাড়া চুইঝাল কফ পরিষ্কার করার পাশাপাশি সর্দি জ্বর ভালো করে। রান্নায় যেকোনো মাছ ও মাংসের স্বাদ বাড়াতে চুইঝালের জুড়ি নেই। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে চুই ঝালের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। অনলাইনেও কেনা যায় চুইঝাল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র প্রকাশ, বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলায় প্রায় ৩৯০ হেক্টর জমিতে চুইঝালের চাষ হচ্ছে। শুধুমাত্র খুলনা জেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে চুইঝালের চাষ হচ্ছে। হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন ৪ দশমিক ১৭ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে জেলায় বছরে মোট ২শ’ ৫০ মেট্রিক টন চুইঝাল উৎপাদিত হয়। খুলনা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ডুমুরিয়া উপজেলা চুইঝাল উৎপাদনের শীর্ষে। এই উপজেলায় ২০ হেক্টর জমিতে অর্থকরী ফসল চুইঝাল উৎপাদিত হচ্ছে। এছাড়া পাইকগাছায় ৯ হেক্টর, বটিয়াঘাটায় ৮ হেক্টর, রূপসায় ৫ হেক্টর এবং ফুলতলায় ৫ হেক্টর জমিতে চুইঝালের চাষ হচ্ছে।
সূত্রমতে, পাহাড়ি চুইঝালের পাশাপাশি খুলনায় উৎপাদিত চুইঝালের কদর বেশি। খুলনার চুইঝালের দামও দ্বিগুন। খুলনার পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি চুইঝাল এক থেকে দেড় হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর অপেক্ষাকৃত কম মানের চুইঝাল ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা স্থানভেদে পাইকারি দামের চেয়ে প্রতি কেজিতে ২শ’ থেকে ৪শ’ টাকা বেশি নিয়ে থাকেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য মতে, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮শ’ টন চুইঝাল উৎপাদিত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের উৎপাদন হয়েছিল ৭শ’ ৫০টন। প্রতি বছরই এর উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বটিয়াঘাটার শিয়ালী ডাঙ্গার কৃষক শরীফ শাকিল বলেন, দুই বিঘা জমিতে চুইঝাল লাগিয়ে সফলতা পেয়েছি। এই জমি আমার অনাবাদি ছিল। তবে কোন কোন বছর এখানে ধুনছে গাছ রোপন করতাম। কিন্তু গতবছর চুইঝাল রোপন করে এ বছর দেড়-দুই লাখ টাকা বিক্রি করেছি।
ডুমুরিয়াার কৃষক মিরাজুল ইসলাম বলেন, চুইঝালের গোশত রান্না অমৃত স্বাদ লাগে। তাই শখের বসে চুইঝাল লাগাই এবং পরবর্তীতে আমি বানিজ্যিকভাবে চুই চাষে আত্মনিয়োগ করেছি। বর্তমানে আমি ৪ বিঘা জমিতে সাড়ে ৩ লাখ টাকার চুইঝাল বিক্রি করেছি।
মুজগুন্নীর সজিব হাওলাদার বলেন, আমাদের এ অঞ্চলে চুইঝাল দিয়ে রান্না গরুর মাংসের একটি সুনাম ও ঐতিহ্য রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা এ অঞ্চলে আসলে অবশ্যই তারা চুইঝালের গোশত খেতে চুকনগর ও খুলনা জিরোপয়েন্টে ছুটে আসে।