স্টাফ রিপোর্টার : দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল) এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর প্রশাসনিক অরাজকতার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কারখানার উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) জনাব মোঃ তাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার প্রত্যক্ষ মদদ ও দুর্নীতির সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। লেবাসধারী ‘দরবেশ’ সেজে দাপ্তরিক কাজের চেয়ে ধর্মীয় আচার ও ব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং সিবিএ নেতাদের দিয়ে কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার এক ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে।
প্রশাসনের মাথায় ‘ফেরাউন’ তকমা পেয়েছে দপ্তরে সিবিএ-র আড্ডায় দিন কাটে।
কারখানার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ডিজিএম (প্রশাসন) তাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার অফিস কক্ষ এখন সিবিএ নেতাদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দিনের পর দিন পড়ে থাকলেও কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ মেলা ভার। অথচ সিবিএ নেতাদের উপস্থিতিতে কর্মকর্তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও হেনস্থা করা তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কারখানার ভেতরে তিনি এখন ‘ফেরাউন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদে ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও ধর্মীয় ভণ্ডামি, একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, জনাব তাজুল ইসলাম দাপ্তরিক কাজের চেয়ে তাবলীগী কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার করছেন বেশি।
প্রতি সপ্তাহে ২-৩ দিন সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ৩০ কিমি দূরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মার্কাজ মসজিদে যাতায়াত করেন।
কারখানার আশেপাশে বা বাসা থেকে মসজিদে যেতেও তিনি প্রটোকলের গাড়ি ব্যবহার করেন, যার মাসিক জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা।
মসজিদে প্রবেশের সময় তার জুতা খুলে দেওয়া এবং বের হওয়ার সময় জুতা পরিয়ে দেওয়ার জন্য একজন নিরাপত্তা প্রহরীকে সার্বক্ষণিক নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন তিনি, যা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার
দুর্নীতির বিশাল নেটওয়ার্ক এই তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু দুর্নীতির খাত চিহ্নিত করা হয়েছে
গাড়ি মেরামত ও প্রটোকল খরচের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে নগদ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে।
পদোন্নতি বাণিজ্য জমজমাট, কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তালিকায় নাম ওঠাতে ১,১০,০০০ টাকা পর্যন্ত চুক্তির অভিযোগ উঠেছে, যার একটি বড় অংশ তিনি অগ্রিম গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়।
সুত্র মতে, শ্রমিক হাজিরাতে জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাজ না করিয়েই লেবার কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে প্রতি মাসে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। এমনকি ফরহাদ নামের এক শ্রমিক ৩ মাস অনুপস্থিত থাকলেও তার হাজিরা দেখিয়ে ৫০ শতাংশ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে।
কর্মকর্তাদের ওপর শারীরিক লাঞ্ছনা ও প্রাণনাশের হুমকিও দেয়া হয়েছে, বিগত কয়েক মাসে এএফসিসিএল-এ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করেছে।
সিবিএ সাধারণ সম্পাদক আবু কাউছার কর্তৃক হিসাব বিভাগীয় প্রধান রেজওয়ানুল হককে জুতা দিয়ে মারতে যাওয়ার ঘটনায় তাজুল ইসলাম ও তত্কালীন এমডি নীরব ভূমিকা পালন করেছেন।
নারী কর্মকর্তার নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) জলি বেগম উক্ত ঘটনার সত্য সাক্ষ্য দেওয়ায় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
সিবিএ নেতাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। এছাড়া তৌফিকুজ্জামান, জহিরুল ইসলাম ও মাহমুদ সাহেবের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা এখন নিয়মিত বিষয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদী খননে কোটি টাকার ‘খেল’ সবচেয়ে বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে জেটি সংলগ্ন নদী খনন প্রকল্প নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, এএফসিসিএল-এর নিজস্ব জায়গা ও রাস্তা ব্যবহার করে নদী খননের বালি ভরাট করা হচ্ছে, অথচ কোম্পানি কোনো ক্ষতিপূরণ বা ভাড়া পাচ্ছে না। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রশাসন প্রধান এবং সিবিএ-র শীর্ষ নেতাদের পকেটে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা গিয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
বিসিআইসি-র মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে এমন প্রকাশ্য লুটপাট ও প্রশাসনিক অরাজকতা প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা মনে করছেন, দ্রুত এই ‘দরবেশ’ রূপী প্রশাসক এবং তার দোসর সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় বড় ধরনের শ্রমিক-কর্মকর্তা সংঘর্ষ বা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাধারণ কর্মকর্ত এবং কর্দেমচারীদের দাবি অবিলম্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে তাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার দুর্নীতি ও সিবিএ-র তান্ডবের বিচার নিশ্চিত করা হোক।
ফার্টিলাইজার কারখানায় অরাজকতা আশুগঞ্জ সার কারখানায় ‘মগের মুল্লুক’: প্রশাসকের আস্কারায় সিবিএ-র হাতে জিম্মি কর্মকর্তারা, হরিলুট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা
প্রকাশিতঃ মে ২, ২০২৬, ০৭:১৭