১ মে বিশ্ব শ্রম দিবস: সাংবাদিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৯:১৭

শেখ মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম: ১ মে—বিশ্ব শ্রম দিবস, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক মর্যাদার জন্য কত ত্যাগ, আন্দোলন ও ইতিহাসের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। শ্রমের এই সার্বজনীন দর্শন সাংবাদিক সমাজের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ সাংবাদিকরাও শ্রমজীবী—তাদের শ্রম শারীরিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক; তাদের হাতিয়ার কলম, ক্যামেরা ও সত্য অনুসন্ধানের সাহস।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা, বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতা, আজও নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছে। রাজধানীর বাইরে কর্মরত সাংবাদিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তাহীনতা, স্বল্প পারিশ্রমিক, অনিশ্চিত চাকরি এবং সামাজিক-প্রশাসনিক চাপের মধ্যে কাজ করেন। তারা অনেক সময় স্থানীয় ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন, হুমকি-ধামকি ও নির্যাতনের শিকার হন। তবুও সত্য প্রকাশের দায়বদ্ধতা থেকে তারা পিছু হটেন না।
গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—গত ১৭ বছরে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন, হামলা ও হত্যার ঘটনা আমাদেরকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই সময়ে অন্তত ৬৭ জন সাংবাদিক জীবন দিয়েছেন, যারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন এবং সত্য প্রকাশের সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি জাতির গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন।
এই ৬৭ জন শহীদ সাংবাদিকের পরিবার আজও অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্র যদি তাদের এই আত্মত্যাগকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস ক্ষীণ হয়ে পড়বে। তাই আমরা জোর দাবি জানাই—এই শহীদ সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে,
শহীদ সাংবাদিক পরিবারের জন্য মাসিক ভাতা বা পেনশন চালু করা
সন্তানদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করা
পরিবারের একজন সদস্যের জন্য সরকারি/আধা-সরকারি চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করা
চিকিৎসা সেবায় বিশেষ সুবিধা প্রদান
একটি স্থায়ী সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল গঠন করা
এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হত্যার বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এই সংকট কখনোই দূর হবে না।
আজকের এই বিশ্ব শ্রম দিবসে আমরা শুধু অতীতের সংগ্রাম স্মরণ করব না, বরং ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে অঙ্গীকার করব। সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই আন্দোলনে আমরা কোনোভাবেই পিছু হটব না।
আমরা বিশ্বাস করি—একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা মানেই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা।
পরিশেষে, ১ মে আমাদের জন্য শুধুমাত্র একটি দিবস নয়—এটি একটি চেতনা, একটি অঙ্গীকার, একটি সংগ্রামের নাম। শহীদ সাংবাদিকদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে আমরা শপথ নিই—সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই আমরা অব্যাহত রাখব। তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদেরকে আরও দায়িত্বশীল, সাহসী ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জয় হোক শ্রমজীবী মানুষের, জয় হোক সত্যের, জয় হোক গণতন্ত্রের।

লেখক: বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক এসোসিয়েশন এর মহাসচিব শেখ মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।