বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে চরম অগ্নিঝুঁকিতে। হোটেল রেষ্টুরেন্ট, আধুনিক স্থাপনা, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ৯৫ শতাংশ রয়েছে এ ঝুঁকির আওতায়। আর বড় স্থাপনাগুলোতে আধুনিকতার ছোয়া থাকলেও নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। নির্মান নকশায় রয়েছে যথেষ্ট ত্রুটি। যে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সহ অন্যান্য ব্যাংক বীমা এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ ১০৫টি প্রতিষ্ঠান অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া খুলনা মহানগরীর বড় বাজারসহ, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ৪৭টি মার্কেট অগ্নিঝুঁকির তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ত্রুটি থাকায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে আগুন নেভানো সম্ভব হবে না। আগুন থেকে নিরাপদ রাখতে ফায়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৯ দফা পরামর্শ দিয়েছে।
সূত্রমতে, খুলনা মহানগরীর ১১টি আবাসিক এলাকার ৬৬টি ভবনের নকশায় ত্রুটি রয়েছে। সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের অর্ধশত আবাসিক ভবনের একই অবস্থা। আবাসিকের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী ভবনও রয়েছে। এই ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না রেখেই হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কম্পিউটার ব্যবসা, ওষুধের ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের শোরুমের ব্যবসা চলছে। পর্যাপ্ত নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা, সরুপথ, অল্প জায়গায় বেশি দোকানসহ নানা কারণে অগ্নিকা-ের ভয়াবহ ঝুঁকিতে এসকল প্রতিষ্ঠানগুলো। যে কোনো ছোট দুর্ঘটনায় এসব বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষিত করাসহ সরু গলিপথ প্রশস্ত করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
সূত্রমতে, সম্প্রতি সোনাডাঙ্গা থানাধীন ডেল্টা ভবনের পাশে একটি হার্ডবোর্ডের দোকানে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকান্ডে দোকানটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সম্প্রতি খুলনা নগরীর বড় মির্জাপুর এলাকায় একটি ছাতা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় অবস্থিত ‘রহমান ছাতা কোম্পানি’ নামে একটি ছাতা উৎপাদনকারী বহুতল কারখানার গোডাউনে প্রথমে আগুন লাগে বলে জানা গেছে। এছাড়া খুলনা মহানগরীর খালিশপুরের মুজগুন্নি এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সাতটি দোকান ও দুটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার গ্যারেজ। এ ঘটনায় খালিশপুর জামায়াতে ইসলামী কার্যালয়ের কিছু আসবাবপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের শহরের প্রাণকেন্দ্রজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার দোকানপাটে প্রতিদিনই চলছে কোটি টাকার লেনদেন। কিন্তু এই জমজমাট ব্যবসার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি। খুলনা মহানগরীর বড়বাজার, নিক্সন মার্কেট, সোহরাওয়ার্দী বিপণিবিতান, হেরাজ মার্কেট, ভৈরব স্ট্যান্ড রোডের বাজার, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বড় বাজার, নিউ মার্কেট এবং বিপনি বিতানগুলো সহ অন্তত অর্ধশত বাণিজ্যিক কেন্দ্র রয়েছে অগ্নিকা-ের উচ্চ ঝুঁকিতে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগোছালো বৈদ্যুতিক তার, সরু গলি, পর্যাপ্ত নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা এবং পানি সরবরাহের অভাবই এই বিপদের মূল কারণ। এসব মার্কেটে ঢুকলেই বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা নাজুক। চার-পাঁচ ফুট প্রশস্ত গলির দুই পাশে সারি সারি দোকান। কোথাও পথ বন্ধ করে রাখা পণ্যের স্তূপ, আবার কোথাও বৈদ্যুতিক তারের ঝুলন্ত জটলা। এমন পরিবেশে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে গরমের দিনে নিঃশ্বাস ফেলা দায়, আর আগুন লাগলে বেরোনোর পথও থাকবে না।
এ চিত্র শুধু এক মার্কেটের নয়, প্রায় সব বাণিজ্যিক এলাকাতেই একই পরিস্থিতি। এসব মার্কেটে নেই ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের সুযোগ, নেই অগ্নিনির্বাপণের প্রাথমিক কোনো ব্যবস্থা। মার্কেটগুলোর দেয়ালে ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তারের জটলা যেন দুর্ঘটনার আগাম বার্তা। সব মিলিয়ে আতেঙ্কেই দিন কাটে সাধারণ ব্যবসায়ীদের।
ফায়ার সার্ভিসের সূত্র বলেছে, বিভাগীয় শহর খুলনার সরকারি জুটমিলের মধ্যে প্লাটিনাম, ক্রিসেন্ট, স্টার জুটমিল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেয়া হয়েছে। তারা ২০২১-২২ সাল থেকে ফায়ারের লাইসেন্স নবায়ন করে না। তাদের ফায়ার সেফটি প্লান করতে বলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য হেভিওয়েট ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নার্গিস মেমোরিয়াল হাসপাতাল, রাশিদা মেমোরিয়াল, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, হোটেল রয়্যাল, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, জোহরা মেমোরিয়াল, বয়রা ক্লিনিক, কিওর হোম, প্রাইম ক্লিনিক, আদ্বীন মেডিকেল কলেজ, সিটি মেডিকেল কলেজ, গরীব নেওয়াজ, বাংলাদেশ আই হসপিটাল, ল্যাবএইড, শিশু হাসপাতাল, খালিশপুর ক্লিনিক উল্লেখযোগ্য।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শহরের কেন্দ্রস্থলে গড়ে ওঠা এসব বাজারে কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। এখনই সিটি কর্পোরেশন, কেডিএ, বিদ্যুৎ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নতুন করে পরিকল্পনা নিতে না পারলে বড় বিপর্যয় আসন্ন।