এসএসসির প্রথম দিনে উৎসবের আমেজ

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ২১, ২০২৬, ০৭:৫৬

স্টাফ রিপোর্টার : এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে রাজধানীর মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল কেন্দ্র ঘিরে সকাল থেকেই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। একই অবস্থা প্রতিটি পরীক্ষার কেন্দ্রে কেন্দ্রে। তবে ভেতরে আনন্দ-উৎসবে সন্তানরা পরীক্ষা দিলেও বাইরে উদ্বিগ্ন রয়েছেন অভিভাবকরা। একইসঙ্গে এদিন পরীক্ষার্থীদের সড়কে তীব্র যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকেই কেন্দ্রের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। পরীক্ষার্থীরা কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে এসে জড়ো হয় গেটের সামনে। অনেককে শেষ মুহূর্তে বই দেখে নিতে দেখা যায়, আবার কেউ গল্প করে নিজেদের চাপ কমানোর চেষ্টা করে।
সারাদেশে একযোগে মঙ্গলবার শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। এদিন কেন্দ্রের ভেতরে পরীক্ষা দিচ্ছেন সন্তানরা। অন্যদিকে বাইরে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। সন্তানের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। ফলে চিন্তা তো একটু হবেই। আজ প্রথম দিন বাংলা বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা তাদের সন্তানদের এসএসির প্রথম পরীক্ষা হওয়ায় সকাল সকাল এসেছেন। কেন্দ্র খুলেছে সকাল সাড়ে নয়টায়। এরপর ১৫ মিনিটে সকল পরীক্ষার্থীদের ঢুকিয়ে গেট লাগিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই মুহূর্তে কেন্দ্রটির বাইরে শতশত অভিভাবক অপেক্ষা করছেন। কেন্দ্রের বাইরে কোনো বসার জায়গা না থাকায় তারা ফুটপাত এবং বন্ধ দোকানপাটের সামনে বসে অপেক্ষা করছেন। পরীক্ষা শুরু হয়েছে সকাল ১০টায় এবং শেষ হবে দুপুর ১টায়। এই তিন ঘণ্টা তারা বাইরেই অপেক্ষা করবেন বলে জানিয়েছেন। বাইরে অপেক্ষমান কমবেশি সকল অভিভাবকদের হাতে বই, খাতা ও ছোট খাট জিনিস রাখার ব্যাগ। আশরাফ আহমেদ নামে এক অভিভাবক বলছিলেন, ছেলেকে কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিলাম। আশপাশে তো বসার জায়গা নেই তাই হেঁটে সময় কাটাচ্ছি কিন্তু আজ তো ভীষণ গরম। ফলে কতক্ষণ থাকতে পারি সেটাই। অন্যদিকে অনেক অভিভাবক প্রিয় সন্তানকে কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিয়ে স্ত্রী, আত্মীয়স্বজনকে মোবাইলে কল করে দোয়া চাচ্ছেন। সন্তানদের পরীক্ষায় অংশ নিতে নিয়ে আসা মা–বাবা ও স্বজনরা কেন্দ্রের গেটের সামনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। কেউ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে, কেউ পাশের ছায়াযুক্ত স্থানে বসে অপেক্ষা করেন। পরীক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন অভিভাবকেরা। অনেককে সন্তানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখে দোয়া করতে দেখা যায়। কেউ প্রবেশপত্র ঠিক করে দেন, কেউ আবার শেষবারের মতো কিছু নির্দেশনা দিয়ে বিদায় জানান। মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল কেন্দ্রের সামনে কথা হয় অভিভাবক নাসিমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, ছেলেকে পরীক্ষার হলে ঢুকিয়ে দেওয়ার পর তার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। সন্তানের সিট ঠিকমতো হয়েছে কি না, সে স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পেরেছে কি না—এই চিন্তাই বারবার মনে আসছিল। মতিঝিল গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুল কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করা অভিভাবক শহিদুল ইসলাম বলেন, সকালে রাস্তায় কিছুটা যানজট থাকলেও সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পেরেছেন। তবে ভেতরে যেতে না পারায় বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করাটাই এখন প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের সামনে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কথা বলছেন। কেউ সন্তানদের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন, কেউ আগের বছরের পরীক্ষার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অপেক্ষার এই সময়টুকু পার করতে অনেকে মোবাইলে কথা বলেন, কেউ আবার কেন্দ্রের গেটের দিকে তাকিয়ে সময় গোনেন। অভিভাবক রেজাউল করিম জানান, সন্তান ভেতরে পরীক্ষা দিচ্ছে আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সময়টা সহজ নয়। তারপরও নিয়ম মেনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, তারা শুধু চান সন্তান যেন ভালোভাবে পরীক্ষা শেষ করতে পারে।
কেন্দ্রগুলোর সামনে কিছু ছোট দোকানও এ সময় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। পানি, বিস্কুট, কলম, পেন্সিল ও স্কেল বিক্রি করতে দেখা যায় বিক্রেতাদের। মতিঝিল এলাকার বিক্রেতা সোহেল মিয়া জানান, পরীক্ষার সময় এ এলাকায় সবসময়ই ভিড় থাকে এবং বিক্রি বাড়ে। সকাল থেকেই ক্রেতার চাপ ছিল। আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করা পরীক্ষার্থী সিয়াম আহমেদের বাবা জানান, ছেলেকে ভেতরে পাঠানোর পর তিনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। অপেক্ষার সময়টা দীর্ঘ মনে হলেও সন্তানের পরীক্ষার কথা ভেবে ধৈর্য ধরে আছেন। মতিঝিল গার্লস স্কুল কেন্দ্রের সামনে থাকা অভিভাবক নাসির উদ্দিন বলেন, সন্তানরা বড় একটি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, তাই তারাও মানসিকভাবে তাদের সঙ্গে আছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেও মন সবসময় ভেতরের দিকেই থাকে। সকাল থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কেন্দ্রের সামনে ভিড় এক ধরনের স্থির অপেক্ষার পরিবেশ তৈরি করে। কেউ গাছের নিচে বসে থাকেন, কেউ পরিচিতদের সঙ্গে আলাপচারিতায় সময় কাটান। পরীক্ষা চলাকালীন সময় ভিড় কিছুটা কমলেও শেষের দিকে আবার গেটের সামনে জমতে শুরু করে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলে আবারও অভিভাবকেরা গেটের সামনে জড়ো হন। একে একে শিক্ষার্থীরা বের হলে তাদের ঘিরে তৈরি হয় স্বস্তির আরেকটি দৃশ্য। কেউ সন্তানের খোঁজ নেন, কেউ পরীক্ষার অভিজ্ঞতা জানতে চান, আবার কেউ দ্রুত বাসার পথে রওনা দেন। তবে দিনের শুরুতে গরম আবহাওয়ার কারণে অনেকে হাঁপিয়েও উঠেছেন। বেশিরভাগ নারী অভিভাবকদের হাতে কাগজের তৈরি বিশেষ হাতপাখা দেখা গেছে। মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল, বালিকা, বালক, বেগম নুরজাহান, লালমাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্তত অর্ধশত বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র পড়েছে। তবে যারা গতবার অকৃতকার্য হয়ে এবার আবার পরীক্ষা দিচ্ছে তাদের জন্য কেন্দ্রটিতে আলাদা দুটি রুম বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিভাবক রেজাউল করিম মনে করেন, এমন স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকলে শিক্ষার্থীরা চাপমুক্ত থেকে পরীক্ষা দিতে পারবে। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী অদ্বৈতের বাবা আব্দুল আলিম বলেন, ছেলেকে ভেতরে দিয়ে আসলাম। এখন অপেক্ষা করছি। ওর মা আজ আসেনি। নুরজাহান বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর নিলার বাবা ময়নুল জানালেন, তার চার মেয়ে। বড় মেয়ে আজ পরীক্ষা দিচ্ছে। ফলে দিনটি বিশেষ তার কাছে। মেয়েকে যথাসময়ে কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। বাইরে অপেক্ষা করছেন তিনি। তিনি বলছিলেন, আমরা যখন পরীক্ষা দিয়েছি তখন বাবা-মায়েরা সঙ্গে আসতো না। আমরা স্যারদের সঙ্গে গ্রামের ভ্যানে চড়ে কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু এখন তাদের সঙ্গে আসতে হয়। পরীক্ষা না শেষ হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকতে হবে। কথা হয় এসএসসি পরীক্ষার্থী মাহিন হাসান এর সঙ্গে। তিনি জানান, সকালে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও কেন্দ্রে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় তা অনেকটাই কেটে গেছে। একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসা রাকিব হোসেন বলেন, আজকের পরিবেশ তার কাছে পরীক্ষার দিনের চেয়ে উৎসবের দিনের মতো মনে হচ্ছে। তবে পরীক্ষার কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের মধ্যেও ছিল ভিন্ন ধরনের আবেগ। কেউ সন্তানের পোশাক ঠিক করে দিচ্ছেন, কেউ দোয়া করছেন। অভিভাবক নাসিমা আক্তার বলেন, সারা বছরের প্রস্তুতির পর আজকের দিনটি তাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাই সকালেই ছেলেকে নিয়ে কেন্দ্রে এসেছেন। শহিদুল ইসলাম নামের আরেক অভিভাবক জানান, সন্তানকে পরীক্ষার হলে পাঠানোর মুহূর্তে আলাদা এক অনুভূতি কাজ করে। কেন্দ্রের প্রবেশপথে শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করতে দেখা যায়। দায়িত্বরত শিক্ষকরা প্রবেশপত্র যাচাই করে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের ভেতরে পাঠান। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা চোখে পড়েনি। দায়িত্বে থাকা শিক্ষক আব্দুল কাদের জানান, প্রথম দিন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা থাকলেও তারা নিয়ম মেনেই কেন্দ্রে প্রবেশ করেছে এবং পরিবেশ স্বাভাবিক ছিল। কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় ছোট ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। কলম, পেন্সিল, স্কেল ও পানির বোতল বিক্রি করতে দেখা যায় অনেককে। বিক্রেতা সোহেল মিয়া বলেন, পরীক্ষার সময়টাতে তার বিক্রি বাড়ে এবং সকাল থেকেই ভালো ক্রেতা পাচ্ছেন। এদিন সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হলে কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন অভিভাবকরা। কেউ গাছের নিচে, কেউ ফুটপাতে বসে সময় কাটান। কয়েকজনকে নিজেদের সন্তানের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করতেও দেখা যায়।
রাজধানীর সড়কে তীব্র যানজট, ভোগান্তিতে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা: এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে রাজধানীর মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির জটলায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে একই চিত্র দেখা গেছে। পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সকাল ৭টা থেকেই যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে রামপুরা থেকে লিংকরোড ও নতুন বাজার পর্যন্ত সড়কেও যানবাহনের চাপ দেখা গেছে। এছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রের আশপাশের সড়কজুড়ে অভিভাবকদের জটলা তৈরি হওয়ায় সড়কের যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অনেকেই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রের সামনের সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি, যা যান চলাচলে আরও বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। এদিন সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের আশপাশের সড়কে দুই পাশে অভিভাবকদের জটলা তৈরি হয়েছে। অনেকেই কেন্দ্রের গেটের সামনে অবস্থান নেওয়ায় শিক্ষার্থী ও যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে শুধু এই কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীরাই নয়, আশপাশের অন্যান্য কেন্দ্রগামী শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তিতে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে মাইকিং করে বারবার যানবাহন না দাঁড় করাতে এবং অভিভাবকদের দ্রুত সড়ক ত্যাগের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। ফলে যানজট দীর্ঘায়িত হয়ে সড়কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, প্রথমদিনে সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অংশ নিচ্ছে মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন।