উপকুলীয়াঞ্চলে তরমুজের বাম্পার ফলন: চাষীদের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ১২:০৯

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: উপকুলীয়াঞ্চলে এবার তরমুজ চাষীদের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। দিগন্ত জোড়া মাঠে কেবল তরমুজের সমরাহ। রীতিমত কৃষি বিপ্লবের হাতছানি। বাম্পার ফলন হওয়ায় চলতি মৌসুমে প্রায় সাড়ে ৭শ’ কোটি টাকার তরমুজ বাজারজাত হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। এ অঞ্চলের এই বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কৃষকদের এক নতুন আশার আলো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

চলতি বছর গ্রীষ্মের তাপাদাহ লক্ষ্যনীয়। যে কারণে চাহিদা বাড়ছে রসালো ফল তরমুজের। এক মৌসুমে সারা দেশের বাজারে তরমুজ সরবরাহ হয় দুই ধাপে। প্রথম ধাপে বরিশাল, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরা অঞ্চল থেকে বেশি তরমুজ আসে। দ্বিতীয় ধাপে অর্থাৎ শেষ ভাগে বাজারে খুলনার তরমুজের সরবরাহ বাড়ে। খুলনা বিভাগের তরমুজ আকারে ছোট ও স্বাদ ভালো। আকারে ছোট হওয়ায় দামও থাকে ক্রেতাদের হাতের নাগালে। এখন চলছে খুলনার তরমুজের সময়। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, আকারে ছোট ও স্বাদ ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে এখন খুলনার তরমুজের চাহিদা বেশি।

খুলনা এলাকার তরমুজচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুলনার তরমুজ চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে এদের আকার ছোট। আকারে ছোট হলেও খুলনার তরমুজ অন্যান্য এলাকার তরমুজের তুলনায় ওজন কিছুটা বেশি হয়। খুলনার ছোট সাইজের তরমুজের ওজন হয় ৩ থেকে ৬ কেজি; আর বড় সাইজের তরমুজের ওজন হয় ৬ থেকে ১১ কেজি। এই এলাকার তরমুজের ভেতরের অংশ বেশি লালচে হয়। আর দানার সংখ্যাও বেশি হয়।

সূত্রমতে, বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে চলতি মৌসুমে তরমুজের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের পরিশ্রমে শুরুতে আশাবাদী ছিলেন চাষীরা। তবে জ¦ালানি সংকটের কারণে পাইকারি ক্রেতারা বাইরের জেলা থেকে আসতে না পারায় চরম ক্ষতির আশঙ্কায় পড়েছেন খুলনাঞ্চলের চাষীরা। ফলে শত শত চাষি আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের রবি মৌসুমে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল জেলায় ১৮ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু খুলনা জেলাতেই ১৩ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে যা এই অঞ্চলের প্রধান উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রতি বিঘা জমিতে এবার গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০টি তরমুজ উৎপাদিত হয়েছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো।

বর্তমান বাজার দর ও সম্ভাব্য চাহিদা অনুযায়ী প্রতি বিঘার তরমুজ অন্তত ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে একজন কৃষক বিঘা প্রতি প্রায় ৪০ হাজার টাকা নিট লাভ করতে পারবেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে মোট উৎপাদন খরচ যেখানে ৩১০ কোটি টাকার কিছু বেশি সেখানে সম্ভাব্য বিক্রয় মূল্য ধরা হয়েছে ৭২৩ কোটি টাকার ওপরে। এতে পুরো অঞ্চল থেকে লাভ আসতে পারে প্রায় ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

বিগত অর্থবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই অঞ্চলের তরমুজ চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়া এবং খরার প্রভাবে ফলন কম হওয়ায় অনেক কৃষক এ বছর চাষাবাদে কিছুটা অনীহা দেখিয়েছেন। এ কারণেই মূলত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ হাজার ২৪৫ হেক্টর কম জমিতে আবাদ হয়েছে। তবে যারা আবাদ করেছেন তারা এখন ফলন দেখে বেশ আনন্দিত। খুলনার বাজুয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা এবং মোংলার বানিয়াশান্তর মতো এলাকাগুলো তরমুজ উৎপাদনে এবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, খুলনাঞ্চলের মধ্যে দাকোপে সবচেয়ে বেশি তরমুজের আবাদ হয়। গত বছরের লোকসানের রেশ থাকলেও এবার কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশক সময়মতো সরবরাহ করা হয়েছে। যদি আগামী কয়েক সপ্তাহ আবহাওয়া স্থিতিশীল থাকে এবং কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড় বা শিলাবৃষ্টি না হয় তবে এই অঞ্চলের উৎপাদিত তরমুজ দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরণের অবদান রাখবে। উপকূলীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে এই রসালো ফলটি এখন অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বিশাল বাণিজ্যের হাতছানি স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, খুলনার তরমুজের বাহারি নাম আছে। খুলনা অঞ্চলে বিগ ফ্যামিলি, বিগ পাঞ্জা, পাকিজা, বিগ পাকিজা, এশিয়ান ২, সাকুরা, সুইট ড্রাগন, জাম্বু জাগুয়ার, ওয়ার্ল্ড কুইন, আস্থা, মালিক-১, এশিয়া সুপার, থাই রেড কিং, বাংলালিংক ও বিগ সুপার কিং জাতের তরমুজের বেশি চাষ হয়।