বি এম রাকিব হাসান, খুলনা:
কাঙ্খিত বৃষ্টি না হওয়ায় খুলনার উপকূলবর্তী অঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। গভীর নলকূপে পানি উঠছে না। পানি নিয়ে রীতিমত কারবালা। উপকুলীয়াঞ্চলের ৩০ লাখ মানুষের দুর্ভোগের সাথে সাথী হয়েছে খোদ খুলনা মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডেও প্রায় ২৫ হাজার পরিবার। তাই প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচীর মাধ্যমেই পানির আধার সৃষ্টি করাই হতে পারে পানি সংকট মোকাবেলার টনিক। দ্রুত নেমে যাওয়া পানির স্তর আবার যৌবণ ফিরে পেতে পারে। তার জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাষ্টার প্লান করে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে সিডর আইলায় বিধ্বস্ত দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপকুলের বাসিন্দারা। জলাশয় কিংবা গভীর নলকূপের মতো উৎস থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও আয়রনের কারণে তা পানের উপযোগী নয়। সরকারের কিছু প্রকল্প চালু থাকলেও মাষ্টার প্লানের অভাব ও দীর্ঘ মেয়াদী স্থায়ী প্রকল্প গ্রহন না করায় উপকুলবাসীকে যুগের পর যুগ তীব্র সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানি পান করায় কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
সূত্রমতে, খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার বেশির ভাগ ইউনিয়নে গভীর নলকূপ সফল হয় না। লবণপানি ওঠে। কয়রা দক্ষিণ বেদকাশী, উত্তর বেদকাশী, কয়রা, মহারাজপুর, মহেশ্বরীপুর ও পাইকগাছার সব কটি ইউনিয়ন, দাকোপের তিলডাঙ্গা, বানিশান্তা, পানখালী এবং বটিয়াঘাটা উপজেলার সুরখালী ও জলমা ইউনিয়নে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফুলতলা ও রূপসা উপজেলার কিছু অংশেও খাওয়ার পানির সংকট চলছে। বর্তমানে জেলার ৩০ শতাংশ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছে। জেলার ৭৮ হাজার গভীর নলকূপে একই সমস্যা। গত বছর ঐ সব উপজেলায় ১৮ থেকে ২২ ফুট পানির স্তর নামলেও এ বছর ক্ষেত্রবিশেষ ২৫ থেকে ২৭ ফুট নিচে পানির স্তর নেমে গেছে।
সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার সাতক্ষীরা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৭টি উপজেলায় সব সময়ই খাওয়ার পানির সংকট থাকে। এসব এলাকার পানির স্তর ২৭ থেকে ২৯ ফুট নিচে নেমে গেছে। এছাড়া অগভীর নলকূপে লবণ ও আর্সেনিক শনাক্ত করা হয়েছে। ফলে এখানকার পানি নিরাপদ নয় বলে জনস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী ইব্রাহিম মোহাম্মাদ তৈমূর জানান, উপকুলীয়াঞ্চলে নতুন আবাসন বৃদ্ধি পাওয়ায় পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতিতে বৈরীভাব চলছে সারা বছর। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি প্রায় প্রতিটি বাড়িতে উত্তোলন করা হচ্ছে। ঐ পানি অনেক ক্ষেত্রে গবাদি পশুর খামার, ভবন নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণে পাথর-খোয়া ভেজানো এবং বালু ভরাটেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এতেও পানির অপচয় হচ্ছে এবং মাটির নিচের একটা স্তরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ উপজেলায় সংকট মেটানো হতো। প্রায়োজনের তুলনায় বৃষ্টিপাত খুবই কম। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প অনেক ক্ষেত্রে অচল হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অযাচিত ব্যবহার, ভূ-উপরস্থ পানির আধার নষ্ট ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতি বছর নেমে যায় পানির স্তর। ফলে খুলনা মহানগরীর দত্তবাড়ি, ফুলবাড়ীগেট, দৌলতপুর, খালিশপুর, নয়াবাটি, বাস্তুহারাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে পানির জন্য হাহাকার।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে মহানগরীর এক থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে পানির স্তর নেমেছে অন্তত ৩০ ফুট। ফলে গ্রীষ্মকাল এলেই গভীর নলকূপ থেকে আর পানি ওঠে না। অন্যান্য নলকূপে যে পরিমাণ পানি উঠছে, তার ভেতরে আয়রনসহ অন্যান্য রাসায়নিক ও ক্ষতিকর খনিজ পদার্থ থাকায় তা পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জালোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিডর, আইলা, ফনী, আম্ফান ইত্যাদি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল সংখ্যক উপকূলবাসীর ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, বৃক্ষ-বাগান, ধ্বংস হয়েছে। আরো একটা বড় ক্ষতি হয়েছে এই যে, উপকূলভাগে লবণাক্ততার বিস্তার ঘটেছে এবং অনেক স্থানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলার উপযুক্ত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য বলে গণ্য হলেও যুগের পর যুগ কোনো সরকারই কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, তালা, দেবহাটা, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, মংলা, রামপাল, চিতলমারী, মোড়েলগঞ্জ, বাগেরহাট ও শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পানি সংকট আছে। এই এলাকার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ কমবেশি খাবার পানির সংকটে রয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাওসেড এর নির্বাহী পরিচালক শামীম আরেফিন বলেন, পানির সমস্যা সমাধানে সবার আগে আমাদের নিজেদের সচেতন করতে হবে। অযাচিত পানির ব্যবহার কমাতে হবে। পানির স্তর বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভূ-উপরিস্থ পানির আধার যেমন পুকুর, খাল বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে পানির স্তর নেমে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। তাতে গভীর নলকূপে পানি পাওয়া ভবিষ্যতে আরও কষ্টকর হবে। আর ওয়াসার মূল দায়িত্ব হচ্ছে সব মানুষকে মানসম্মত পানি দেয়া। সেটাই তারা করতে পারছে না।