স্টাফ রিপোর্টার : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে (২০০৯-২০২৩ সাল) বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাচার হওয়া এই বিপুল অর্থ উদ্ধারে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেছেন, দেশব্যাপী পর্যায়ক্রমে আগামী চার বছরের মধ্যে চার কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য উপস্থাপন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের বরাতে জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ ছিল বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা)। অর্থ পাচারের প্রধান গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং (চীন)। তিনি আরও জানান, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (এমএলএটি) স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি পাওয়া গেছে। বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তিটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, আদালতের নির্দেশে এখন পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ক্রোক হওয়া সম্পদের পরিমাণ ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, দেশ-বিদেশ মিলিয়ে মোট ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে এ সংক্রান্ত ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টির চার্জশিট দাখিল এবং ছয়টির রায় প্রদান সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোট ১১টি মামলাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দেশের বড় কয়েকটি শিল্পগ্রুপের নাম রয়েছে। তালিকায় রয়েছেন— শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবার এবং সামিট গ্রুপ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের অর্থপাচার ও দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিচার করা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার। বর্তমান সরকার দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং দমনে সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
জাতীয় সংসদে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের একটি আধুনিক ডিজিটাল উদ্যোগ, যেখানে পরিবারকে উন্নয়নের মূল একক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নারীদের হাতে এই কার্ড দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পরিবারের নারী সদস্যদের কাছে সহায়তা পৌঁছালে তা বেশি কার্যকরভাবে খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় ব্যয় হয়। এতে অপচয় কমে এবং পরিবারের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়। তিনি আরও বলেন, নারী সদস্যের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হলে পরিবারে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও মর্যাদা বাড়বে, যা নারীর ক্ষমতায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বর্তমান অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ১০ মার্চ দেশের ১৩টি জেলার তিনটি সিটি করপোরেশন ও ১৫টি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে এ কর্মসূচি চালু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে এর আওতায় আনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ের মধ্যে আরও ৩০ হাজার পরিবারকে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১, ২০২৬, ১৩:৪১