সফিকুল ইসলাম: ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে চরম ভোগান্তিকে সঙ্গী করে নিজ নিজ অফিস-আদালতসহ কর্মস্থানে ফিরেছে সাধারণ মানুষ। এরআগে সড়ক-নৌ ও রেলপথে নানা ভোগান্তি নিয়ে স্বপরিবারে ঢাকায় ফিরেছেন তারা। তবে এবারের ঈদযাত্রায় বাড়ি ফেরা ও কর্মস্থলে স্বস্তিতে ফিরতে পারেনি যাত্রীরা।
জানা গেছে, ঈদের দীর্ঘ ছুটির পর মাঝে দুই দিন খোলা ছিল অফিস, এরপর ফের তিন দিনের ছুটি শেষ সব প্রতিষ্ঠান খুলেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ ছুটি শেষে গতকাল রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছে। যে কারণে সকাল থেকেই রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় লক্ষ্য করা গেছে কাজে বের হওয়া মানুষের ভিড়, যানবাহনের দীর্ঘ সারি, থেমে থেমে যানজট, দোকানপাটে সরব উপস্থিতি। সব মিলিয়ে ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ পর স্বরূপে ফিরেছে রাজধানী ঢাকা। গতকাল রোববার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এদিন সকালের পর থেকেই মিরপুর, বাড্ডা, নতুনবাজার, গুলিস্তান ও মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়তে দেখা গেছে। বাসপয়েন্টগুলোতে দীর্ঘ সারি, কোথাও ধীরগতির যানচলাচল আবার কোথাও জটলার চিত্র চোখে পড়ে। ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ। মগবাজার এলাকায় সকালেই বহু যাত্রীকে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কোনো বাসে সামান্য জায়গা পেলেই ছুটে যাচ্ছেন তারা। অধিকাংশ গণপরিবহনে যাত্রীর চাপ এতটাই বেশি যে দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। অনেকে ঝুঁকি নিয়েই বাসের দরজায় ঝুলে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বাড্ডা লিংক রোডে রাইদা পরিবহনের এক যাত্রী বলেন, ছুটির পর প্রথম অফিসে যাচ্ছি। প্রথম দিন দেরি হলে সমস্যা হবে, তাই ঝুঁকি নিয়েও উঠতে হচ্ছে। নতুনবাজার এলাকার গাড়িচালক মোহাম্মদ রফিকের ভাষায়, ঈদের পর প্রথম কর্মদিবস, তাই চাপ বেশি। তবে ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। গুলিস্তান ও কলেজগেট এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। গুলিস্তানে ধামরাই পরিবহনের এক যাত্রী বলেন,ফাঁকা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করলে আজ অফিসে পৌঁছানো যাবে না। কলেজগেটে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী রেজাউল আমিন বলেন, কয়েকদিন খুব আরামে চলাচল করেছি, কিন্তু আজ রাস্তায় সেই পুরোনো ভিড় ফিরে এসেছে। পরিস্থিতির চাপে অনেকেই হাঁটার পথ বেছে নিচ্ছেন। বাঁশতলা থেকে বারিধারার উদ্দেশ্যে হেঁটে যাওয়া শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বাসে এত ভিড় যে ওঠার সুযোগ নেই। অফিস কাছাকাছি হওয়ায় হেঁটেই যাচ্ছি। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। তারা বাসপয়েন্টে নিয়ন্ত্রিতভাবে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করছেন এবং প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। দায়িত্বে থাকা এক সদস্য বলেন, যানজট এড়াতে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দিচ্ছি না, সড়কের গতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঈদের আগের মঙ্গলবার থেকে টানা ৭ দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়। এরপর ঈদ শেষে রাজধানীর সড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা ছিল,বেশিরভাগ দোকানপাট খোলেনি। বিগত এক সপ্তাহ ঢাকার চিরচেনা রূপ হারিয়ে এমন চিত্র ছিল সর্বত্র। তবে রোববার থেকে কর্মচঞ্চলতাসহ রাজধানী ঢাকা তার স্বরূপে ফিরে এসেছে। রাজধানীর মহাখালী এলাকায় কথা হয় রাইড শেয়ারিং করা মোটরসাইকেল চালক মনসুর আলী সঙ্গে। তিনি বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে ফের রাইড শেয়ারিং শুরু করেছি, কিন্তু সেভাবে যাত্রী ছিল না রাজধানীতে। ফাঁকা ফাঁকা ছিল পুরো শহর। সে তুলনায় প্রথমদিনের কর্ম দিবস শুরু হওয়ার পর থেকে রাজধানী বিভিন্ন এলাকাতে যানজট দেখা দিয়েছে। প্রচুর মানুষের আনাগোনা। যানবাহন, মানুষের ভিড় সর্বত্রই। বলতে গেলে ঈদের পর আজই প্রথম মানুষের ভিড়-যানজট সৃষ্টি হয়েছে। নিজেও সকাল থেকে বেশ কয়েকটি ট্রিপ পেয়েছি। সাভার থেকে ছেড়ে আসা বৈশাখী বাসের চালক হাবিবুর মিয়া যাত্রীসহ বাস নিয়ে গাবতলী, কল্যাণপুর, আগারগাঁও, মহাখালী, গুলশান হয়ে উত্তর বাড্ডায় আসার পর কথা হয় এই চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, সকাল থেকে আমাদের রুটের প্রতিটি স্টপেজেই যাত্রী পেয়েছি। যা গেল এক সপ্তাহ ধরে ছিল না। আজ থেকে সব অফিস আদালত খোলার কারণে সকাল থেকে মানুষের এবং যানবাহনের সংখ্যা পথে পথে বেশি দেখা যাচ্ছে। আগের মতই সিগন্যাল, যানজট পড়তে হচ্ছে। সেই হিসেবে বলতে গেলে আজকে থেকেই ঢাকার স্বাভাবিক চিত্র দেখা যাচ্ছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সুজন আহমেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, মার্কেটিং এ কাজ করার কারণে প্রতিদিনই ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হয়। ঈদের পরপর আমাদের প্রতিষ্ঠান খুললেও পুরো শহর জুড়ে মানুষের আনাগোনা ছিল খুব কম। সেভাবে যানজটেও পড়তে হয়নি, মানুষের ভিড়ও দেখা যায়নি। সেই তুলনায় আজ বলতে গেলে ঢাকা শহর তার নিজের স্বাভাবিক রূপে ফিরে এসেছে। সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে থেমে থেমে যানজট দেখেছি, সড়কে পথে-ঘাটে মানুষের পর্যাপ্ত ভিড়, যানবাহনগুলোর পর্যাপ্ত উপস্থিতি সড়কে দেখা গেছে।
এদিকে, রাজধানীতে ফিরে প্রথম কর্মদিবসে যোগ দিতে নানা দুর্ভোগ, দীর্ঘ যানজট আর বিভিন্ন পরিবহনের থেমে থেমে চলায় অস্বস্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। তবে উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রা ছিল চরমে। যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কে তীব্র যানজট। বাসের শিডিউলেও দেখা গেছে বড় বিপর্যয়। অনেক জায়গায় বাস ছেড়েছে শিডিউলের ১২ ঘণ্টা পর। অর্থাৎ রাতের বাস পরের দিন সকালে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়া হয়েছে। রেলপথেও নেই স্বস্তি। নন-এসি বগিতে যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাদে বসে ঢাকায় ফিরেছেন। শনিবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা বেশির ভাগ ট্রেনই সময়মতো কমলাপুরে পৌঁছাতে পারেনি। ক্ষেত্রবিশেষে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্তও বিলম্ব হয়েছে। সড়কে ভোগান্তি এড়াতে স্বস্তির আশায় ট্রেনকে বেছে নিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তবে সময়মতো কর্মস্থলে যোগ দিতে নৌপথে ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় ফিরছে দক্ষিণাঞ্চলের কর্মজীবী মানুষ। প্রায় সব লঞ্চেই ছিল অতিরিক্ত যাত্রী। সড়কেও ছিল যানবাহনের চাপ। এবারও আগের মতো সড়ক ও নৌপথে বাড়তি ভাড়া দিতে হয়েছে মানুষকে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহনের চাপের কারণে চলাচলে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ করা গেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, সড়কপথে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে যেখানে দুই আড়াই ঘণ্টা লাগে অন্য সময়, সেখানে এখন লাগছে ৭-৮ ঘণ্টা। ঈদ শেষে ফিরতি যাত্রায় শনিবার রাত ৩টা থেকেই যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ অংশে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এর ফলে কড্ডারমোড় থেকে শুরু হয়ে যানজট ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিভিন্ন স্থানে। যমুনা সেতুর পশ্চিম টোল প্লাজা থেকে সায়দাবাদ রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত দীর্ঘ ঢাকায় ফিরতে দুর্ভোগের শেষ নেইযানজটের সৃষ্টি হয়। এ যানজট আর ধীরগতির রেশ ছিল শনিবারও। যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে টাঙ্গাইল এলাকায় যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পাশাপাশি সেতু ও মহাসড়কে একাধিক যানবাহন বিকল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এ সময় যানবাহনের চাপ সামাল দিতে যমুনা সেতুর চার লেনই ঢাকাগামী যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় রওনা হওয়া সাংবাদিক মাহাবুর আলম সোহাগ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাত ১টায় গাড়িতে উঠে সকাল ৬টায় এসে পৌঁছেছি সিরাজগঞ্জে। তীব্র যানজট লেগেই আছে। তিনি বলেন, এমনিতেই দেশে চলছে তেল সংকট। এরপরও ঈদে উত্তরবঙ্গের যানজটে নষ্ট হলো কয়েক লাখ টন জ্বালানি। সরকার চাইলে সেটা রক্ষা করতে পারত। গাইবান্ধা থেকে ১৪ ঘণ্টায় বাসে ঢাকায় পৌঁছেছেন আসাদুজ্জামান সুমন। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে সাড়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ঢাকায় আসা যায় সেখানে আড়াই গুণ সময় বেশি লেগেছে। চরম বিরক্তিকর অবস্থা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরতে ভোগান্তিতে পড়েন সাংবাদিক ইমরান চৌধুরী। তিনি বলেন, সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়েছিলাম। মহাসড়কে তেমন যানজট না থাকলেও গাড়ির চাপ বেশি থাকায় ধীরগতিতে চলেছে। বিকাল ৪টায় রাজধানীর শনির আখড়ায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় তীব্র যানজট। সব মিলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে ১১ ঘণ্টা লেগেছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে লাগে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। এদিকে ছুটি শেষে মানুষ ঢাকায় ফেরায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরছে রাজধানী ঢাকায়। গত কয়েকদিনের তুলনায় রাজধানীর সড়কে যানবাহনের উপস্থিতি বেড়েছে। যানজট না থাকলেও গতকাল উত্তরা, বিমানবন্দর ও খিলক্ষেত এলাকায় দেখা গেছে গাড়ি ধীরে ধীরে চলছে।
প্রসঙ্গত, ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটি দিয়ে শুরু হয়ে ১৯ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঈদের টানা ছুটি ছিল। ২১ মার্চ ছিল ঈদের দিন। এরপর ২৪ ও ২৫ মার্চ অনেকেই অতিরিক্ত ছুটি নেওয়ায় ঢাকায় ফেরা ধীরগতিতে হয়। ফলে রোববার থেকে রাজধানীতে কর্মচাঞ্চল্য ধীরে ধীরে পুরোপুরি ফিরে আসছে।