উত্তরায় কিটামিন ল্যাবে মাদকের মিনি কারখানার সন্ধ্যান ; তিন চীনা নাগরিক গ্রেফতার

প্রকাশিতঃ মার্চ ২৬, ২০২৬, ১৩:৪৭

তুরাগ থেকে মনির হোসেন জীবন : রাজধানীর অভিজাত এলাকা উত্তরায় বিলাসবহুল বাসা ভাড়া নিয়ে চীনা নাগরিকরা তৈরি করতেন শরীর থেকে মন আলাদা করার মতো ভয়ানক নেশাজাতীয় কৃত্রিম

‘কিটামিন’ মাদক। পরবর্তীতে অভিনব কৌশলে এসব মাদক সাউন্ডবক্সে- খেলনায় করে শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও চীনে চোরাচালান করতো সংঘবদ্ধ একটি বিদেশি নাগরিকের চক্র । এ ঘটনায় তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

আটককৃতরা হলেন- লি বিন, জু জি ওরফে জুঝি ও চুনসেন জাং ওরফে চুনসেং ইয়াং । আটকের পর তিন বিদেশি নাগরিকের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন মাদক, মাদকদ্রব্য তৈরির বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, কিটামিন মাদক তৈরির কাজে ব্যবহৃত বিকার, ফ্যানেল, হিটার, ডিজিটাল মিটার, ঝাড়, এপ্রোন, গ্লাভস, মাক্সসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী উদ্ধারমূলে জব্দ করা হয়। জব্দকৃত এসব মাদক ও
সরঞ্জামাদির আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৪০/৫০ কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার (২৫ মার্চ, ২০২৬) দিবাগত রাতে
উত্তরা পশ্চিম থানার ১০ নম্বর সেক্টরের ১/এ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাসার ৭ম তলায় (লায়লা গার্ডেন)
থেকে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। বুধবার রাত ৮টা থেকে ওই বহুতল বাড়িতে অভিযান শুরু হয়ে একটানা মধ্যরাত পর্যন্ত চলে।

আজ বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অভিযানকালে ওই ভবনের বাসিন্দা রুহুল আমিন সাংবাদিকদের জানান, চীনা নাগরিকরা ৭/৮ মাস ধরে বসবাস করতো। আমরা শুরু জানতাম এখানে বিদেশি থাকতো। কিন্তু তারা কী করতো, সে বিষয়ে আমরা জানতাম না। তারা বাহিরে তেমন একটা যাতায়াত করতো না। গভীর রাতে এই বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে বিকট শব্দ হত। গত রাতেও শব্দ হয়েছিল।

মাদক তৈরি ও বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রুহুল বলেন, তারা যে মাদক তৈরি করতো, তা কখনোই আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। কারণ, তারা আমাদের সাথে মিশতো না। তাদের ফ্ল্যাট সব সময় ভেতর থেকে বদ্ধ থাকতো।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরা পশ্চিম থানার ১০ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আমরা কিটামিন মাদক তৈরির একটি ল্যাব পাই। সেই সঙ্গে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন মাদক, সালফিউরিক অ্যাসিড, এথানলসহ কিটামিন মাদক তৈরির সব ধরনের মালামাল জব্দ করা হয়েছে। তবে বাইর থেকে দেখে বুঝার উপায় ছিল না যে তারা এখানে মাদকের ল্যাব তৈরি করেছে।

মেহেদী হাসান আরও বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকেই কিটামিন মাদক তৈরিতে দক্ষ বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এ মাদক তৈরির জন্য তারা লোকাল মেডিসিনও ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে তারা এসব মাদক শ্রীলঙ্কার পাচার করতেন।

বিপুল পরিমাণ কিটামিন মাদক জব্দ এবং মাদক তৈরির ল্যাবের সন্ধান প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমে একটি কুরিয়ার সার্ভিস থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়। পরে সেখানকার সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে এবং প্রেরকের তথ্য সংগ্রহ করে উত্তরায় অভিযান চালানো হয়।

বাংলাদেশি বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ ল্যাবে পাওয়া গেছে। দেশীয় ওষুধ কোম্পানির কেউ জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, কিটামিন মাদক তৈরির কাঁচামাল কোথা থেকে কীভাবে সংগ্রহ করা হতো এবং ওষুধ কোম্পানির কেউ জড়িত রয়েছে কি না, এসব বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে জানা যাবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, এ চক্রটি ধরতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রেখেছি। চলতি বছরের গত রমজানে কয়েক দিন আমরা এই এলাকাতেই সাহরি করেছি।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া চীনা নাগরিকরা ব্যথানাশক ও স্লিম হওয়ার ওষুধ বিশেষ মাধ্যমে প্রক্রিয়া করে কিটামিন মাদক তৈরি করতেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, এ চক্রের সঙ্গে একটি চীনা কমিউনিটি বেশ সম্পৃক্ত। দেশ-বিদেশের চীনা নাগরিকদের মাঝে এই মাদক বিক্রি করা হতো।

চোরাচালানের বিষয়ে জানতে চাইলে এই অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, চীনা নাগরিকরা বিশেষ কায়দায় সাউন্ড বক্স, খেলনার মধ্যে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে বিদেশে এসব মাদক পাচার করতেন।

মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া চীনা নাগরিকরা দীর্ঘ দিন ধরে এই বাসাটিতে থাকতেন। তারা লোকাল মার্কেট থেকে বিভিন্ন কাঁচামাল সংগ্রহ করে ল্যাবের মাধ্যমে পাউডারজাত করে কিটামিন মাদক তৈরি ও চোরাচালান করতেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত ব্যক্তিরা (তারা) মাদককারবারির সাথে জড়িত বলে স্বীকার করেছে। আটক তিন চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।