গবাদিপশু পালনে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা খুলনাঞ্চলে কোরবানীর পশু সংকট নেই

প্রকাশিতঃ মে ১৩, ২০২৬, ১৬:২২

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো: খুলনাঞ্চলে বাণিজ্যিক গরুর খামার ও গবাদিপশু পালন একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। খামারিরা সফল হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে। এ অঞ্চলে কারবানীর পশু সংকট নেই এবার ঈদুল আযাহায়। চাহিদার তুলনায় পশু উৎপাদন বেশি থাকায় এবার দামও ক্রেতাদের নাগালে থাকার আশা করা হচ্ছে। খুলনা বিভাগে এবার ১০.৭৯ লাখ পশুর চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৪.৪৭ লাখ কোরবানির পশু রয়েছে। প্রতি বছর কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে এখানে ব্যাপক হারে গরু মোটাতাজাকরণ করা হয়, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীতেও পাঠানো হয়।

কোরবানির সময় খুলনা বিভাগে ব্যাপক গবাদিপশুর চাহিদা থাকে, যা অনেক সময় স্থানীয় উৎপাদন (১৪ লাখেরও বেশি পশুর প্রাপ্যতা) দিয়েও চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকে। শিক্ষিত ও শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে আধুনিক পদ্ধতিতে গরুর খামার গড়ে তুলে সফল হচ্ছেন। স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর ইনজেকশন ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে (খড়, ঘাস, গম, ভূষি) গরু মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে, যা নিরাপদ মাংসের চাহিদা বাড়াচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে টিকা, কৃত্রিম প্রজনন ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলোও সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে। করোনাকালীন সময় থেকে অনলাইনে গরু বিক্রির যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা খুলনার খামারিদের জন্য একটি বড় সুবিধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে গবাদি পশু পালনে বেশ কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্তমানে গো-খাদ্যের (খড়, ভূষি, ঘাস) দাম অনেক বেশি, যা খামারের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় খামারগুলোতে উন্নত জাতের গাভী বা বাছুরের অভাব, যা দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনকে ব্যাহত করে। সঠিক সময়ে টিকার অভাব এবং দক্ষ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের অভাব, বিশেষ করে গ্রামে। এছাড়া অনেক খামারি সঠিক নিয়ম মেনে টিকা (শুধু ২৬.৭% কৃষক) দেন না। ক্ষুদ্র খামারিরা প্রায়াশই মূলধনের অভাবে ভালো জাতের গরু কিনতে পারেন না। এছাড়া, আকস্মিক মহামারি বা চুরির ঝুঁকি থাকে। অনেক খামারে আধুনিক শেড বা ঘর নেই, ফলে গরমকালে বা বর্ষায় গরুর রোগবালাই বেড়ে যায়। কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উন্নত জাতের বাছুর উৎপাদন নিশ্চিত করা। খামারিদের কম খরচে পুষ্টিকর খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া। সরকারি চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত টিকাদান ও কৃমিনাশক ব্যবহার করা। খামারিদের প্রযুক্তিগত ও ব্যাবসায়িক প্রশিক্ষণ দেওয়া।খুলনাঞ্চলে সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গরুর খামারের সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।

খুলনা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিওএলএস) পরিচালক ড. মোহাম্মদ গোলাম হায়দার বলেন, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১০.৭৯ লাখ, যেখানে গত বছর তা ছিল প্রায় ৮.২৯ লাখ। কিন্তু এ বছর পবিত্র ঈদুল আযহার আগে কোরবানির পশুর দাম কমানোর জন্য ১৪.৪৬ লক্ষ পশু প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, এখন স্থানীয় পশু দিয়েই শতভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে, কারণ বিভাগে মোট ৩,৬৭,৩৬০টি উদ্বৃত্ত পশু থাকবে, যা চাহিদার চেয়ে ৭৪.৬১ শতাংশ বেশি। যেহেতু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ পর্যাপ্ত, তাই দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ‘ঈদুল আযহার আগেই বিভাগের ১০টি জেলা এবং খুলনা শহরের অস্থায়ী পশুর হাটে বিপুল পরিমাণে কোরবানির পশু আনা হবে। ফলে খুলনার চাহিদা মেটাতে অন্য দেশ থেকে পশু আমদানি করার কোনো প্রয়োজন নেই’ বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এদিকে পরপর তিনবার টেন্ডার আহবান করেও কোন সাড়া না পাওয়ায় বরাবরের মতো এবারও জোরাগেট পশুর হাট পরিচালনা করবে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। গত বছর কোরবানীর পশুর হাট পরিচালনা করে কেসিসি ২ কোটি ৭ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছিল। এছাড়া খুলনা বিভাগের বেশ কিছু জেলায় গবাদি পশুর হাট বসতে শুরু করেছে, যদিও ব্যবসায়ী ও ইজারাদাররা বলছেন, আরও এক সপ্তাহ পর পুরোদমে কেনাবেচা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভাগের দশ জেলায় ১০,৭৯,৪৪৯টি কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে ৩,৬৭,৩৬০টি উদ্বৃত্ত রেখে মোট ১৪,৪৬,৮০৯টি কোরবানির পশু স্থানীয়ভাবে পালন করা হয়েছে। এ বছরের কোরবানির পশুগুলোর মধ্যে রয়েছে ষাঁড় ১,৩০,৪২৭টি, বলদ ৩২,০২৭টি, গরু ৮২,৩০২টি, মহিষ ৪,০৮৯টি, ছাগল ৮.৫১,৩৭০টি, ভেড়া ৫১,১৭৩টি এবং অন্যান্য ২১৬টি।

রূপসা উপজেলার খামারী রফিক হোসেন বলেন, তিনি প্রায় এক বছর ধরে শুধু ঘাস, ভুট্টা, গমের ভুসি ও স্থানীয় পশুখাদ্য ব্যবহার করে সাতটি দেশি গরু পালন করছেন, পশুগুলোকে সুস্থ এবং ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। পশুখাদ্যের দাম বাড়ার কারণে এ বছর পশুর দাম কিছুটা বেশি হবে। আমার খামারে এখন গরুর পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি ছাগলও রয়েছে।

এদিকে কেসিসি জানায়, এবার কোরবানীর পশুর হাটে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকবে। পশু ও মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য রাখা হবে মেডিকেল টিম। হাটে এসে কেউ যেন প্রতারণার শিকার না হয় সেজন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর জোর টহল থাকবে। তাছাড়া নকল টাকা প্রতিরোধে থাকবে বিভিন্ন ব‍্যাংকের বুথ। এক সপ্তাহ আগে থেকে হাট শুরু করতে হবে। ইতিমধ্যে হাট পরিচালনা করার জন্য কেসিসি সচিব (ভারপ্রাপ্ত) রহিমা খাতুন বুশরাকে আহবায়ক ও বাজার শাখার কর্মকর্তা শেখ শফিকুল হাসান দিদারকে সদস্য সচিব করে ৩২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।