দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে হাম আতঙ্ক: দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১৫:৪৭

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো: দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলায় হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হওয়ায় রোগীদের মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। প্রতিদিনই গায়ে ব্যথা, তীব্র জ্বর, সর্দি ও লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে রোগীরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসছেন। যার অধিকাংশ ভর্তি না হয়ে বাড়িতে অবস্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছে। আর স্বল্প সংখ্যক যারা ভর্তি হচ্ছে তাদের ভোগান্তির শেষ নেই বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন প্রতিনিয়ত।

খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশু রোগীর সংখ্যা দুইশ’ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে চিকিৎসকরা। এমন পরিস্থিতির মধ্যে হামের উপসর্গের সাথে স্বাসকষ্টসহ অন্যান্য শিশু রোগীদের চিকিৎসায় খুলনায় কোনো আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে কোমলমতি শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছে অভিভাবকরা। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ এর পূর্ণাঙ্গ রূপ এখনও দেয়া সম্ভব হয়নি। হাম ও জ¦রের রোগীরা অস্বস্থ্যকর মেঝতে এবং ওয়ার্ডে ঢালাওভাবে অন্যান্য রোগীদের সাথে চিকিৎসা নিচ্ছে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ১৩ এপ্রিল বিকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় ২ শতাধিক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এছাড়া বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে এ সংখ্যা ৫ শতাধিক। হাসপাতালগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্তত ৩৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই অল্পবয়সি শিশু। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সি এবং ৬ থেকে ৯ মাস বয়সি শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। যেসব শিশু এখনো পূর্ণ টিকাদান পায়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি তিন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের বয়স ৫ থেকে ৮ মাসের মধ্যে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় তাদের জটিলতা বেড়েছে।

এদিকে খুলনায় হামের নতুন ভেরিয়েন্টে প্রতিদিন হু হু করে শিশুরা ভর্তি হলেও খুলনার কোনো সরকারি হাসপাতালে শিশুদের জন্য এনআইসিইউ এবং ভেন্টিলেশন সাপোর্ট নেই। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ বেডের একটি স্ক্যান থাকলেও সেখানে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ নবজাতক রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালে আরও ৩০টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও শিশুদের ভরসা উচ্চ মুল্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে কখনোই ব্যয় মেটানো সম্ভব না।

এছাড়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট খুলনা জেনারেল হাসপাতাল সব সময় রোগীদের সাথে প্রতারণা করে আসছে। হাসপাতালটি ২৫০ সয্যার অর্ধেক বেড খালি থাকলেও এখানে সারাদিনই রোগী খুলনা মেডিকেলে রেফার করা হয়। নামে জেলা সদর হাসপাতাল হলেও খুলনার যে-কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তুলনায় এখানকার কার্যক্রম সীমিত। এছাড়া খুলনার উপর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে শিশু বিভাগই চালু নেই। এছাড়া খুলনায় একটি সরকারি সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও সারা বছরই রোগী শূন্য থাকে। কোনো রোগী ভর্তি হতে আসলেই তাকে রেফার করে রাখা হয়। অথচ হাসপাতালটিতে চিকিৎসক ও নার্স এর সংখ্যা অনুপাত অন্য যে কোন হাসপাতালের থেকে ভোলো।

শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন বলেন, ‘হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ এবং নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকায় সাপোর্টিভ চিকিৎসার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।’

বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সাবেক অতিরিক্ত ডিজি ডা: সুশান্ত কুমার রায় বলেন, রোগীর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। আইসোলেশন ইউনিট চালু থাকলেও শয্যা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা সীমিত। পুরনো অবকাঠামোর কারণে খুলনা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জটিল রোগীদের জন্য এনআইসিইউ সুবিধা সীমিত থাকাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।