# শূন্য খরচের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে ব্যর্থ#
অপ্রস্তুত চুক্তিতে বাড়ছে শ্রমিক ঝুঁকি
# সংস্কার ছাড়া সংকট ফেরার আশঙ্কা
জাহাঙ্গীর খান বাবু:বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ইতিহাস দীর্ঘদিনের হলেও এই খাতে অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি বদলেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, চুক্তির ভাষা পাল্টেছে—কিন্তু বাস্তবতার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বরং প্রতিবারই নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত একই চিত্র সামনে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক ও নীতিগত পর্যায়ে বারবার বলা হয়েছে, শ্রমবাজার হবে উন্মুক্ত, স্বচ্ছ এবং কম খরচে শ্রমিক পাঠানো নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সীমিত কিছু গোষ্ঠী, যাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট তৈরি করে বাজার দখলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে সাধারণ শ্রমিকদের জন্য এই বাজার এখনও ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।
বায়রার যুগ্ন মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের মতে, ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী ঢাকায় এসে শূন্য অভিবাসন খরচে কর্মী নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। তার ভাষায়, “সরকারকে চাপে রেখে সিন্ডিকেট তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।” তিনি মনে করেন, অতীতের মতো এবারও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালেও বিনা খরচে শ্রমিক পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়া সফরের আগে বলেছিলেন, সরকার কোনো সিন্ডিকেটে বিশ্বাস করে না এবং শ্রমবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করছে। তবে এই বক্তব্য বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ২৩ জন বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। এরপর ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই বাজারে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ২০২৩ সালে রেকর্ডসংখ্যক ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। তবে ২০২৪ সালের ৩১ মে হঠাৎ করেই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়, যা নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গা হলো মানসিকতা। তার কথায়, “আমরা শুধু বেশি লোক পাঠানোর দিকে নজর দিই, কিন্তু প্রক্রিয়াটি কতটা সঠিক হচ্ছে তা দেখি না।” তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমিক প্রয়োজন আছে বলেই বাজার পুরোপুরি বন্ধ করা হয় না। বরং কখনো চাপ দেওয়া হয়, আবার কখনো শিথিলতা দেখানো হয়।
তিনি আরও বলেন, এই শ্রমবাজারে দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি পরিচিত সমস্যা এবং এর সঙ্গে মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ কিছু প্রভাবশালী পক্ষ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলে একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসবে।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর ফলে অনেকেই ভুক্তভোগী হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অনেক শ্রমিক উচ্চ খরচ করে গেলেও সেখানে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ পাননি। ফলে তাদের অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে। তার মতে, “একই অভিজ্ঞতা বারবার হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি মনে করেন, নতুন করে শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। প্রয়োজন ছিল পূর্বের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতি নেওয়া। পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোর কোথায় দুর্বলতা ছিল, কোন পক্ষ কী শর্ত মানেনি—এসব বিষয় যাচাই করে নতুন করে কাঠামো তৈরি করা উচিত ছিল।
তার ভাষায়, “শুধু বাজার খুলে দেওয়াই সমাধান নয়। যদি পূর্বশর্তগুলো পূরণ না করা হয়, তাহলে আবার একই সংকট তৈরি হবে।” এই পরিস্থিতিকে তিনি হতাশাজনক হিসেবে উল্লেখ করেন।
বায়রা’র সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান মনে করেন, শ্রমবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া জরুরি। তার মতে, সীমিত সংখ্যক এজেন্সিকে সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং স্বচ্ছতা ব্যাহত হয়। তিনি প্রস্তাব দেন, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সব এজেন্সিকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। পরে তাদের কার্যক্রমের ভিত্তিতে মূল্যায়ন বা গ্রেডিং করা যেতে পারে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, “শুরু থেকেই সুযোগ সীমিত করে দিলে অনেক সক্ষম এজেন্সি নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পায় না।” এতে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নেই এবং প্রতিবারই নতুন করে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে সিন্ডিকেট ভাঙা, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত।
তাদের মতে, এই খাতে স্থায়ী সমাধান পেতে হলে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুই দেশের মধ্যে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রাপ্তি এবং আইনি সহায়তা জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে সিন্ডিকেট ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি না করলে কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, যতদিন নিয়ন্ত্রণ থাকবে সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে, ততদিন এই খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা কঠিন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় হলেও এটি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ব্যবধান কমাতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে যার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারকেই নিতে হবে।