সুন্দরবনে মধু উধাও!

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৮:০২

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: সুন্দরবনে চাঁক আছে মধু নেই। যা আছে চাঁদা ছাড়া মধু সংগ্রহের উপায় নেই। বিপাকে মৌয়ালরা। সমাধানের আশ^াস দিয়েছে বন প্রতিমন্ত্রী। র‌্যাব পুলিশ কোষ্টগার্ডের নিয়মিত টহল চলছে। কিন্তু কোন কিছুতেই আশার আলো দেখছে না বনজীবীরা।

প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক মৌয়াল প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মধু আহরণ করতে বনে ঢোকেন। সুন্দরবন থেকে সংগৃহীত মধু প্রাকৃতিক ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় সারা দেশেই এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে এই মধু সংগ্রহের পেছনে পদে পদে রয়েছে জীবনের ঝুঁকি। বাঘ, বিষধর সাপসহ নানা বন্য প্রাণীর আক্রমণের ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বনদস্যুদের আতঙ্ক।

দ্বায়িত্বশীল সূত্রমতে, উদ্বোধনের পরপরই মৌয়ালিরা ঢুকে যান সুন্দরবনে মধু আহরণের জন্য। কিন্তু মৌয়ালরা জানাচ্ছে মধু কাটতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। মধুর চাঁকে কোন মধু নেই। দুষ্ট চক্র পাশ পারমিটের আগেই চোরাই পথে সুন্দরবনে ঢুকে মধুর চাঁক থেকে মধু সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে। ফলে একটি বছর পর এই পেশার সাথে জড়িত প্রকৃত মৌয়ালরা মধু না পেয়ে বনের অভ্যন্তরে পাশ পারমিটের চালান বাঁচাতে হণ্যে হয়ে ছুটছে। একটু মধু সংগ্রহের আশায় নাভিশ^াস ছুটছে তাদের। বনবিভাগের একশ্রেনীর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে অসাধু সিন্ডিকেট পাশ পারমিটের আগেই মধুর চাঁক থেকে মধু নিয়ে সটকে পড়েছে। ফলে পাশ পারমিট নিয়ে আসা মৌয়ালরা তাদের সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চরমভাবে হিমশিম খাচ্ছে। অপরদিকে সুন্দরবনের ডাকাত বাহিনীরা পাশ পারমিট নিয়ে আসা মৌয়ালদের নৌকা প্রতি চাঁদা দাবি করে তা আদায় করছে। আবার জলদস্যু বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় সিন্ডিকেট চক্র অবৈধভাবে মধু আহরণ করে নিয়ে চলে গেছে। ফলে প্রকৃত মৌয়ালরা এখন চরম হতাশায়।

বন বিভাগের সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর বন রয়েছে। ১–৬ এপ্রিল পর্যন্ত মধু আহরণের জন্য ৯০টি পাস দেওয়া হয়, এতে ৫৭২ জন মৌয়াল বনে প্রবেশের অনুমতি পান।

কিন্তু বনবিভাগের অনুমতি ছাড়াই অনেকে মধু আহরণ করেন। হরিনগর ও আশপাশের মৌয়ালরা জানায়, বনে ঢোকার আগে বিভিন্ন ডাকাত বাহিনীর প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে ‘চুক্তি’ করতে হয়। টাকা দিতে হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। না দিলে ধরা পড়লে নির্যাতন, এমনকি দ্বিগুণ মুক্তিপণের ঝুঁকি থাকে। প্রতি বছর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে মৌয়ালেরা অনেকগুলো নৌকা নিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বনে চাক কাটার উদ্বোধন করতে যান। কিন্তু এবার তা আর হয়নি।

বনজীবীরা জানায়, দাদা, নানাভাই, ডন ও আলিফ ওরফে আলিম এই বাহিনীগুলোর সঙ্গে আলাদা সমঝোতা করতে হয়। পরে জানা গেল, কোস্টগার্ডের অভিযানের কারণে একটি বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় বাকি দুই বাহিনীর সঙ্গে চুক্তি করেই কেউ কেউ বনে ঢুকেছে।

জনপ্রতি মৌয়ালদের কাছ থেকে যে টাকা আদায় করে ডাকাতদের ভাষায় এই চাঁদার নাম ‘ডিউটি খরচ’। এক মৌয়াল দলের তথ্য অনুযায়ী, ৭৩ জন মৌয়ালকে তিন বাহিনীকে মিলিয়ে জনপ্রতি ১৩ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। এ জন্য তাঁদের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। চুক্তির প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয় একটি টোকেন। কখনো ১০ টাকার, কখনো ৫ টাকার নোট। তাতে বিশেষ চিহ্ন বা নাম লেখা থাকে। ডাকাতের হাতে পড়লে এই টোকেন দেখাতে পারলেই মুক্তি, না হলে নির্যাতন।

আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের মৌয়ায়ালী আক্কাস আলী, বেলায়েত হোসেন, মমতাজ আলী, শাহজাহান মোল্লা, আব্দুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, বাবলুর রহমান, রেজাউল হোসেন ও আদম আলী সহ অনেকেই পেশাদার মৌয়ালি এই জানান, আমরা প্রতিদিন প্রতিটা নৌকায় আটজন করে সুন্দরবনে মধু আহারণ করতে যাই আবার প্রতিদিন ফিরে আসি কিন্তু দুঃখের বিষয় কোন চাকে মধু পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে যাচ্ছি সেখানে চাকে মধু আগেভাগে কেটে নিয়ে গেছে তারা জানান এর জন্য দায়ী এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা ও বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগ করে আগেভাগেই সুন্দরবনের প্রায় সকল স্থানের মধু আহরণ করা হয়ে গেছে এখন শুধু পড়ে আছে খালি মৌচাক।

কৈখালী স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ বলেন, ঘটনা শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে সুন্দরবনে খলিসা ও গরান ফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। এরপর আসে কেওড়া ফুলের মধু। এর মধ্যে সবচেয়ে দামি খলিসা ফুলের মধু। চলতি বছর সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল (প্রতি কুইন্টালে ১০০ কেজি) মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় বেশ কিছুটা বেশি। গত বছর বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে মৌয়ালেরা ১ হাজার ৪২৯ কুইন্টাল মধু ও ৪২৯ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেছিলেন।