শেকড়ে ফেরার ডাক: নদীপথে গান ও পথে পথে সংস্কৃতির সন্ধানে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন(ভিডিও সহ)

প্রকাশিতঃ এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১২:২৬

খোরশেদ আলম সীমান্ত: বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যের একজন অন্যতম প্রধান কবি এবং দক্ষ সাংস্কৃতিক সংগঠক। দৈনিক জনতাকে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন দৈনিক জনতার স্টাফ রিপোর্টার খোরশেদ আলম সীমান্ত।
কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন ১৯৬২ সালের ২২ নভেম্বর বৃহত্তর যশোর জেলার কালিগঞ্জ থানার নলভাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ বোরহানউদ্দিন আহমেদ ও মাতা রেবেকা সুলতানা। আশির দশকের কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করা এই মেধাবী ব্যক্তিত্ব একাধারে কবি, লেখক এবং দক্ষ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সমাপন করেন। কর্মজীবনের একটি বড় সময় তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের শেষভাগে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন।
তাঁর কাব্যশৈলী আধুনিক জীবনবোধ, দেশপ্রেম এবং দ্রোহের চেতনায় ভাস্বর। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ও অন্যান্য বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিভ্রমণ’, ‘উদ্বাস্তু রোদে পোড়া মানুষ’, ‘দাবদাহ’ ও ‘নির্বাচিত কবিতা’। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন, যার মধ্যে ২০০৬ সালে প্রাপ্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অন্যতম। এছাড়া তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও মর্যাদাপূর্ণ ‘কাব্যরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমির প্রধান হিসেবে বর্তমানে তিনি দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দৈনিক জনতার পাঠকের উদ্দেশ্যে তাঁর এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো;
দৈনিক জনতা: আসসালামু আলাইকুম। দৈনিক জনতা ও দৈনিক জনতা ডিজিটালের প্রিয় দর্শক ও পাঠকদের শুভেচ্ছা। আজ আমরা এমন একজন মানুষের মুখোমুখি হয়েছি, যিনি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছেন। তিনি কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক। স্টালিন ভাই, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছি। শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
দৈনিক জনতা: মহাপরিচালক হিসেবে আপনার অগ্রাধিকারমূলক কাজগুলো কী কী? রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমাদের সংস্কৃতি চর্চা এখন অনেকটা রাজধানী কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো শেকড়ে ফেরা। জারি, সারি, পালাগান, যাত্রাপালা, পুতুল নাচের মতো লোকসংস্কৃতি যেগুলো আমরা হারিয়ে ফেলেছি, সেগুলোকে আবার শক্তিশালী করতে হবে।
আমার একটি বিশেষ অ্যাকশন প্ল্যান আছে: ১. নদী পথে সুরভ্রমণ: একটি বড় জাহাজে রেকর্ডিং স্টুডিও ও শিল্পীরা থাকবেন। আমরা বিভিন্ন ঘাটে থামব এবং গ্রামবাংলার অজানা গানগুলো রেকর্ড করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেব। ২. পথে পথে ভ্রমণ: বাসে করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি ও গান সংগ্রহ করা হবে।
দৈনিক জনতা: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একাডেমিগুলোকে সক্রিয় করতে আপনার ভাবনা কী?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: ঢাকায় যে অনুষ্ঠানগুলো হয়, সেগুলো জেলা পর্যায়েও নিয়ে যেতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি চর্চায় যুক্ত করতে হবে। বর্তমানে বিনোদনের অভাব ও মাদকাশক্তির একটি বড় কারণ হলো সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব। আমরা জেলা পর্যায়ে আবৃত্তি, সংগীত ও নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করব এবং সেখান থেকে ট্যালেন্ট হান্ট করে সেরাদের ঢাকায় পুরস্কৃত করব।
দৈনিক জনতা: বিশ্বায়নের যুগে দেশীয় সংস্কৃতি রক্ষায় প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং এআই দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ এখন বই পড়া বা ভালো নাটক দেখা কমিয়ে দিয়েছে। আমাদের শালীন হতে হবে এবং পাঠাভ্যাস বাড়াতে হবে। পারস্পরিক বিদ্বেষ দূর করতে সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম।
দৈনিক জনতা: একজন কবি যখন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকেন, তখন সৃজনশীল সত্তা কতটা সহযোগিতা করে?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: সৎ উদ্দেশ্য থাকলে ভালোবাসা দিয়ে অনেক বাধা অতিক্রম করা যায়। আমি মনে করি কঠোরতার চেয়ে ভালোবাসা দিয়ে জয় করা সহজ। আমি প্রশাসনের ভুলগুলোকেও সহনশীলতা ও সংশোধনের দৃষ্টিতে দেখি।
দৈনিক জনতা: আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমাদের সংস্কৃতি তুলে ধরতে কোনো উদ্যোগ আছে কি?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: প্রায় ৪২টি দেশের সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক চুক্তি আছে। এগুলো আরও শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের পারস্পরিক বিনিময় বাড়াতে হবে যাতে বিশ্বদরবারে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি প্রমাণিত হয়।
দৈনিক জনতা : আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে দারিদ্র্য থাকবে না, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে শান্তিতে থাকবে। দৈনিক জনতা সম্পর্কে তিনি বলেন, আশির দশক থেকে আমি দৈনিক জনতায় লিখি। এটি একটি নিরপেক্ষ দৈনিক পত্রিকা হিসেবে টিকে আছে। মানুষের পক্ষে ও দেশের পক্ষে থাকাটাই বড় সংগ্রাম। সবাইকে ভালোবাসাই আমার মূল সূত্র।
দৈনিক জনতা: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
রেজাউদ্দিন স্টালিন: আপনাকে ও দৈনিক জনতাকেও ধন্যবাদ।