বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: চিংড়ি চাষীদের দু:শ্চিন্তা যেন কাটছে না। মৌসুমের শুরুতে ভাইরাসমুক্ত স্বাস্থ্যকর পোনা না পাওয়ায় চিংড়ি সেক্টেরে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তি শুধু নয় বরং এটি ১০ লাখ মানুষের জীবন জীবীকাও বটে। ভালো মানের চিংড়ি পোনা সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহতের পাশাপাশি বৈদেশিক রাজস্ব আয়ে ঘাটতি চরম সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া গেল দু’বছর সরকারীভাবে চিংড়ি চাষীদের মান উন্নয়নে যে প্রণোদনা দেয়ার কথা ছিল সে প্রকল্পটিও এখন হিমাগারে।
বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং যশোর ও নড়াইল জেলার অংশ বিশেষ এলাকায় চিংড়ি চাষ হয়ে থাকে। বিদেশের বাজারে ভেনামী চিংড়ি বাজার দখলের চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের তথা উপকুলীয়াঞ্চলের ন্যাচারাল চিংড়ি এখানো মাতিয়ে রেখেছে ইউরোপ আমেরিকার বাজার। এ অঞ্চলে চিংড়ি চাষ শুধু অর্থনৈতিক কর্মকা- নয়, বরং এটি এ অঞ্চলের হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে মৌসুমের শুরুতেই ভালো মানের পোনার সংকট যেন চাষিদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ভাইরাসমুক্ত, স্বাস্থ্যকর পোনা না পাওয়ায় একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন চাষিরা।
প্রতিবছর মার্চ এপ্রিল মাসে শুরু হয় গলদা ও বাগদা চিংড়ি চাষের মৌসুম। অন্যান্য বছরের মতো এবারও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গলদা ও বাগদা চিংড়ি চাষের মৌসুম শুরু হয়েছে। চাষিদের কেউ ঘের প্রস্তুত করছেন, কেউবা পোনা ছাড়ার অপেক্ষায়। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই চাষিরা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি ভালো মানের, ভাইরাসমুক্ত পোনা পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোয়াইট গোল্ড নামে খ্যাত এই চিংড়ি চাষ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল মানুষের জীবন জীবীকার অন্যতম সোপান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের চিংড়ি চাষিরা সমিতির ঋন নিয়ে কেউ বা আবার মহাজন বা ডিপো মালিকের কাছ থেকে দাদন (অগ্রীম টাকা) নিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু করে। ফলে সঠিক সময়ে গুনগত মানের ন্যাচারাল চিংড়ির পোনা না পেলে চাষীরা সময়মত ঋন পরিশোধ করতে পারবে না। যে কারণে চিংড়ি চাষের শুরুতেই চাষীদেরকে অনেক হিসাব কিতাব করতে হয়।
সূত্রমতে, দেশের শীর্ষ চিংড়ি উৎপাদনকারী খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় চলতি মৌসুমে চিংড়ি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে মানসম্মত পোনার সংকট ও রোগ ছড়িয়ে পড়ায় চিংড়ি মারা যাচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। চাষিরা জানান, এ বছর উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অনেক কম হওয়ার আশংকা। ফলে তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। কচুয়া উপজেলার কলমিবুনিয়া গ্রামের আব্দুর রশিদ বলেন, প্রথম দফায় যে চিংড়ি পোনা ছাড়া হয়েছিল ভাইরাসে তার অধিকাংশ মারা গেছে। এখন দ্বিতীয় দফায় আবার মাছ ছাড়া হয়েছে।
দেশের তিনটি এসপিএফ (স্পেসিফিক প্যাথোজেন ফ্রি) হ্যাচারির একটি খুলনায় থাকলেও এটি এ অঞ্চলের বিশাল চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। স্থানীয়ভাবে ১৪টি সাধারণ হ্যাচারিতে মা বাগদা চিংড়ি থেকে পোনা উৎপাদন করা হলেও মান নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে।
চাষিরা অভিযোগ করছেন, নিম্নমানের পোনা ব্যবহারের ফলে চিংড়ির মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। ঘেরে ছাড়ার এক মাসের মধ্যেই এক তৃতীয়াংশ পোনা মারা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে যা অর্ধেকেরও বেশি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসপিএফ পোনার সঙ্গে সাধারণ পোনা মিশিয়ে বিক্রি করছেন, যা চাষিদের জন্য আরও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বটিয়াঘাটা অঞ্চলের চিংড়ি চাষি হাসান শিকাদার বলেন, ‘গত বছর আমি তিন লাখ টাকা ঋণ করে চিংড়ি চাষ করি। তবে বছর শেষে আমার মূল বিনিয়োগই উঠে আসেনি। এর প্রধান কারণ, অল্প দিনের মধ্যেই আমার অর্ধেক চিংড়ি মারা গেছে। আমরা টাকা খরচ করে চিংড়ির পোনা ক্রয় করি, তবে সেসব পোনা মান সম্মত নয়।’
একই অঞ্চলের আরেক চাষি আব্দুল হক বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে চিংড়ি চাষ করছি। আগে পোনা নিয়ে এত সমস্যা ছিল না, কিন্তু এখন ভালো মানের পোনা পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। বাজার থেকে কিনে আনা পোনা ছাড়ার এক মাসের মধ্যেই প্রায় অর্ধেক মরে যাচ্ছে। এতে আমাদের লোকসান দিন দিন বাড়ছে।’
খুলনার দাকোপ উপজেলার চাষি আজিজুল বাসার বলেন, ‘আমরা ধার-দেনা করে ঘের প্রস্তুত করি, পোনা ছাড়ি। কিন্তু ভাইরাস আক্রান্ত পোনা কিনে ফেললে পুরো বিনিয়োগটাই নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের এলাকায় মানসম্পন্ন হ্যাচারির অভাব, অথচ সরকার থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাই না। যদি ভালো মানের পোনা নিশ্চিত করা যেত, তাহলে আমরা লাভবান হতে পারতাম।’