ফুলে ফুলে সেজেছে সুন্দরবন, আজ থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু

প্রকাশিতঃ মার্চ ৩১, ২০২৬, ০৯:০৯

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: আজ সেই মাহিন্দ্রক্ষণ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আজ ১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। ইতোমধ্যে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় মৌয়ালদের নৌকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। যেন সাজ সাজ রব। মধু আহরণ শুধু পেশাজীবীদের কর্মকান্ডই নয় বরং খানিকটা উৎসবও বটে। বসন্তের এই সময়ে সুন্দরবনে ফুটেছে খলিশা, গরান, পশুর আর হারগোজাসহ রংবেরঙের ফুল। এগুলো ঘিরে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর বনাঞ্চল। সুন্দরবনের খাটি মধু দেশের মধ্যে অনেক জনপ্রিয়। এই মধু আহরণ ও বিপনন নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন আবহ, এক নতুন দিগন্ত। এই মৌসুমে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আজ ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হবে, যা চলবে টানা দুই মাস। এ বছর সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় এক হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর দুই হাজার ৮৫৩ জন মৌয়াল বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে এক হাজার ৪২৯ কুইন্টাল মধু ও ৪২৯ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেছিলেন।

এদিকে, প্রতিবছর বছর ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনের মধু আহরণের মৌসুম শুরু হয়। তবে তার আগেই অসাধু মৌয়ালরা অপরিপক্ব মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহ করছে। এতে মধু উৎপাদন হ্রাস এবং মৌমাছির বংশ বিস্তারের চরম ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আগাম মধু চুরির ফলে সরকার যেমন রাজস্ব হারাবে, তেমনি লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে মৌয়ালদের। পাশাপাশি অপরিণত চাক কাটার ফলে মৌমাছির বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের ইকোসিস্টেম।

এখন সুন্দরবনে ঢুকলেই চোখে পড়ে খলিশা, গরান, পশুরগাছের ফুলে। এগুলোর রং-রূপে বনভূমি যেন সেজে উঠেছে। কেওড়ার ডালে কুঁড়ির মেলা, কাঁটায় ঘেরা হারগোজাও ফুলে ভরে উঠেছে। কচি পাতার সবুজ আর শ্বাসমূলের বিস্তারে বনে যেন নতুন প্রাণ। সেই রূপমুগ্ধ পরিবেশে মৌমাছিরা উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে, সংগ্রহ করছে মধু।

জানা গেছে, দেশব্যাপী সুন্দরবনের খলিশা ফুলের মধুর ব্যাপক চাহিদা। তাই ক্রেতাদের কাছ থেকে অধিক দাম পাওয়ার লোভে অসাধু মৌয়ালরা মাছ ধরার অনুমতি নিয়ে অপরিপক্ব চাক থেকেই মধু কেটে লোকালয়ে এনে চড়া দামে বিক্রি করছেন। এই মধু বিক্রি করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুন্দরবনে গিয়ে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহের ভিডিও প্রকাশ করছেন। এসব বিষয় বনবিভাগের নজরে আসলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।

মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে খলিশা ফুলে মধু আসে। এই মধু স্বচ্ছ, অনেকটা নারকেল তেলের মতো, স্বাদে ঘন ও মিষ্টি, ঝাঁজবিহীন। তবে খলিশাগাছ তুলনামূলক কম থাকায় এ মধুর পরিমাণও তুলনামূলক কম। এরপর ধাপে ধাপে গরান, কাঁকড়া, হারগোজা এবং শেষদিকে কেওড়া ও গেওয়া ফুলের মধু পাওয়া যায়। সময়মতো বৃষ্টি না হলে ফুল দ্রুত ঝরে পড়ে, ফলে মধুর উৎপাদনও কমে যায়।

অনেক মৌয়াল অভিযোগ করে বলেন, বনদস্যুদের চাঁদাবাজির কারণে অনেক মৌয়াল এবার বনে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল অভিযোগ করেন, প্রতি মৌয়ালের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। একেকটি দলকে একাধিক গ্রুপকে টাকা দিতে হচ্ছে। তাই অনেকেই এ বছর সুন্দরবনে যেতে চাইছেন না।

বুড়িগোয়ালিনী এলাকার মৌয়াল শাহাজান সরদার জানান, গত বছর মধু খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ বাঘের মুখোমুখি হয়েছিলাম। চিৎকার করলে সহযোগীরা এসে গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে বাঘটিকে পিছু হটাতে সক্ষম হয়। জীবন ঝুঁকিতে নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়।

বনবিভাগ জানিয়েছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বনজ সম্পদ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুন্দরবনের সাবেক বন সংরক্ষক ও বিশেষজ্ঞ তপন কুমরা দে বলেন, সুন্দরবন ¯্রষ্টার এক অপরূপ সৃষ্টি। বিজ্ঞান এখানে যেন হার মেনেছে। সবকিছুই ঐশ^রিকভাবেই সাজানো গোছানো। এখানে মূলত এপিস ডরসাটা, এপিস সেরানা ও এপিস ফ্লোরিয়া প্রজাতির মৌমাছি দেখা যায়। এর মধ্যে এপিস ডরসাটা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমের শুরুতে এসব মৌমাছি অনেক সময় নিচু ডালেও চাক বাঁধে। আমি মনে করি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকারী ফসল। এ বিষয়ে আগাম মধু চুরি ঠেকাতে টহল জোরদার করা এবং নদীপথে নৌযান তল্লাশি করা জরুরী। এটি নিয়মিত করতে হবে।