সমুদ্র সীমানায় ভারতীয় জেলেরা ফের বেপরোয়া

প্রকাশিতঃ মার্চ ৩০, ২০২৬, ০৬:৩৭

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ হওয়া স্বত্ত্বেও ভারতীয় জেলেরা আবারও চলতি মৌসুমে বেপরোয়াভাবে অনুপ্রবেশ করছে। সাগর শান্ত থাকায় গভীর বঙ্গোপসাগরে চলছে মাছ ধরার এক মহা কর্মযজ্ঞ। নানা প্রজাতির মাছে ভরে উঠছে ফিসিং ট্রলারগুলো। অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের নেশায় সংঘবদ্ধ ভারতীয় জেলেরা প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার মাছ আহরণ করে নিয়ে যায়। কোষ্টগার্ড একের পর এক অভিযান চালিয়ে বিভন্ন সময় এদেরকে আটক করলেও বিস্তর্ণ জলরাশিতে এদের অবাধ অনুপ্রেবেশ কোন ভাবেই যেন ঠেকানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশী জেলেরা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গেলে তখন ভারতীয় জেলেরা তাদের পাশে এসে জাল ফেলে। এমনকি জাল কেটে মাছ ধরে নিয়ে যান তারা। বাধা দিলে তাদের ওপর চড়াও হন। এদের রয়েছে হাই হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিন ফিসিং ট্রলার। এছাড়া রয়েছে আধুনিক কারেন্ট জাল। কিছু কিছু জেলেদের কাছে রয়েছে ফিস ডিটেক্টর মেশিন। যার মাধ্যমে ভারতীয় জেলেরা বঙ্গোপসাগরের কোন অঞ্চলে কত গভীরে কখন মাছের ঝাঁক চলাচল করে তা জানতে পারে।

গত একবছরে সমদ্রসীমা লঙ্ঘন করে এ দেশের জলসীমানায় মাছ ধরার অভিযোগে কোস্টগার্ড সদস্যরা সুন্দরবন উপকূল এলাকা থেকে ৭টি ফিশিং ট্রলারসহ শতাধিক ভারতীয় জেলেকে আটক করেছে। আটককৃত জেলেরা নানা অজুহাতে জামিনে মুক্ত হয়ে প্রত্যাবর্তন করে বার বার আবার বাংলাদেশের সীমানায় মাছ শিকারে লিপ্ত হয়।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমদ্র অঞ্চলের ২০০ নটিক্যাল মাইলের অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্ধারিত হয়। এখানে মাছ ধরার অধিকার বাংলাদেশি জেলের। আইন লঙ্ঘন করে দলবেঁধে ভারতীয় ট্রলারগুলো সীমানা লংঙ্ঘন করছে প্রতিনিয়ত। তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর ছোট ফাঁসের জালে ধরা পড়ে বড় মাছ থেকে রেণু পোনা পর্যন্ত।

জেলেদের অভিযোগ, ইলিশ সহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ আহরণের মৌসুমে গভীর সাগরে তাদের সঙ্গে ভারতীয় জেলেরা দস্যুর মতো আচরণ করেন। হ্যান্ডমাইক দিয়ে ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশি জেলেদের সরিয়ে দেন তারা। নিজ দেশের জলসীমা হওয়ায় কেউ সরতে না চাইলে তাদের দিকে জালে বাঁধার ইট ও চাড়া ছুড়ে মারেন। কেটে দেন জাল। এ ছাড়াও শক্তিশালী ট্রলারের মাধ্যমে ধাক্কা দিয়ে ছোট ছোট বাংলাদেশি ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেন তারা।

পুলিশ জানায়, ভারতীয় জেলেরা ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে সমদ্রসীমা লঙ্ঘন ও মৎস্যসম্পদ লুটের অভিযোগে থানায় মামলা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়। তবে ধরা পড়া এসব জেলে আদালতে দাবি করেন, দিক ভুলে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকেছেন। আইনের মারপ্যাঁচে ছাড়া পেয়ে তারা ফিরে যান।

কোস্টগার্ড পশ্চিম (মোংলা) জোনের অপারেশন কর্মকর্তা জানান, মৎস্যসম্পদ রক্ষায় তারা সমুদ্র এলাকায় সার্বক্ষণিক সক্রিয় আছেন। ভারতীয় জেলের অনুপ্রবেশ রোধে নিয়মিত টহল দেওয়া হয়। গভীর সমুদ্র এলাকায় নৌবাহিনীর সদস্যরা জাহাজ নিয়ে অবস্থান করেন।

দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাধারণত সবসময় ভারতীয় জেলারা আমাদের সীমানায় অবাধ বিচারণ করে থাকে। পাশাপাশি আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা সময় দু’দেশে ভিন্ন। যার ফলে আমাদের জেলেরা যখন মাছ ধরা বন্ধ রাখে সে সুযোগে ভারতীয় জেলেরা আমাদের সীমানায় মাছ শিকারে ঝাপিয়ে পড়ে। তাই দু’দেশের একই সাগর হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার সময় সীমা একই তারিখে করার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ সরকার সেই দাবি এখনও মানেনি। ভারতীয় জেলে অনুপ্রবেশ রোধে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল আরও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। এছাড়া তাদের ট্রলারে জিপিআরএস ও ফিশ ফাইন্ডার রয়েছে। তা দিয়ে দিক নির্ণয় ও মাছের অবস্থান শনাক্ত করে ঘন ফাঁসের নেট দিয়ে মাছ ছেঁকে নিয়ে যায়। ফলে আমরা লাক্ষা, ছুরি, রূপচাঁদা, লইট্যাসহ বিভিন্ন দামি মাছ পাচ্ছি না।