বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: উপকুল জুড়ে কৃষকের মাঠ গ্রাস করছে লবনাক্ততা নামক ভংয়কর বিষ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, ভাঙা ও দুর্বল বেড়িবাঁধ আর বারবার নোনা পানির আগ্রাসনে উপকুলের পলি মাটি নিশে^ষ প্রায়। শত চেষ্টা আর বাড়তি খরচ করেও নাজেহাল ইরি আবাদে প্রান্তিক চাষিরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সরকারি সংস্থা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় কৃষকরা একসঙ্গে উদ্যোগী না হন, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকার বড় অংশই লবণাক্ত হয়ে যেতে পারে। এটা শুধু কৃষি উৎপাদনেই নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের নিরাপত্তা ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
প্রকৃতির নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলের সংগ্রাম মুখর মানুষগুলো। এদের জীবন-জীবিকা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ন। লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন না, উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষিজমি। গৃহপালিত পশুর খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। ইরি বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে দেড়গুন অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে চাষীদের। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ পিছু ছাড়ে না উপকুল বাসীর। বিশেষ করে আইলা, আম্পান, বুলবুল, ইয়াসের মতো সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় জমিতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা লবণাক্ততা এখন কৃষকের গলার ফাঁস।
মৃত্তিকা সম্পদ ইন্সটিটিউট খুলনার আঞ্চলিক কার্যায়ের সংগ্রহ করা পানি ও মাটির নমূনার তথ্য অনুয়ায়ী বটিয়াঘাটার কৃষ্ণনগর এলাকায় মাটিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে ৬.৫ ইসি:ডিএস/মি (ইলেকট্রিককনডাকটিভিটি ডেসিমেল/ মি; মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার একক। এবছর ৭.২ ইসি:ডিএস/মি। পাইকগাছা ও বাগেরহাটের দ্বিগরাজে পাওয়া গেছে ১০.৫ ইসি:ডিএস/মি।
সূত্রটি আরো জানায়, উপকুলের খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট বেষ্টিত নদ-নদীতে লবণাক্ততা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। গেল বছর এপ্রিল মাসে নমুনা পরীক্ষা করে বটিয়াঘাটার গাগড়ামারি নদীতে ২৬ ডিএস/মি (ডেসিসিমেল পার মিটার; পানি পরিমাপের একক ), মংলা পশুর নদ-নদীতে ২৬.৮ মাত্রা লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরার আশাশুনিতে পাওয়া গেছে ২৮.৩ ডিএস/মিটার। যা যে কোনো কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী।
খুলনার মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক জরিপ সূত্রে প্রকাশ, গেল বছর উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১২ লক্ষাধিক হেক্টর জমি লবণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে, কৃষিবিদ আব্দুল গফুর বলছেন, আগামী একযুগে এ অবস্থা রীতিমত ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। তখন রেড এলার্ট জারি ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকবে না।
দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে আমন আবাদের বাম্পার ফলন হলেও উপকুলের মোট জমির এক তৃতীয়াংশ লবণাক্ততার শিকার। এসব অঞ্চলে আমনের উৎপাদনের হার ছিল গড় উৎপাদনের অর্ধেক। চলতি মৌসুমে গত কয়েক বছর বীজ বোনা হয়, কিন্তু চারা ওঠে না। আর যদি ওঠেও, লবণের ঝাঁজে পুড়ে মরে যায়। কৃষক একাধিক দফায় অতিরিক্ত রাশয়নিক সার ও ওষুধের মাধ্যমে অঙ্কুরোদগমের ব্যবস্থা করে। উপকূলীয় জনপদ বাগেরহাটের মংলা, রামপাল, মোড়লগঞ্জ, ফকিরহাট, সাতক্ষীরা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জে আর খুলনার পাইগাছা, কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়ার নিত্যদিনের বাস্তবতা। এক সময় যেখানে তিন মৌসুমে ধান, তিল, সরিষা, পাট, ডাল আর সবজির সমাহার থাকত, সেই জমিগুলো আজ লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকে মাসের পর মাস। খুলনাঞ্চলের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা গত বছরের তুলনায় এবছর দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে বোরো চাষীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে জানায় কৃষিবিদরা।
সূত্রমতে, উপকুলের কৃষি জমির প্রায় ৮৮ ভাগই লবণাক্ততায় আক্রান্ত। শুধু নদীর পানি এবং মাটি নয়; খাল, বিল, পুকুরের পানিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা। এখানকার গাছপালা, পশুপাখি সবই নোনায় বিপর্যস্ত। এ অঞ্চলের উদ্ভিদগুলি অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বিবর্ণ, ধূসর। শাক-সবজি ও মাঠের ফসল কমে গেছে। লবণাক্ততা বাড়ছে পানিতে। লবণ পানি টেনে আনা হচ্ছে ভূমিতে। ফলে ভূমিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। দিন দিন এই অঞ্চলের মাটি ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে উৎপাদিত হয় এমন ফসল লবণাক্ততা সহ্য ক্ষমতার চেয়ে মাটির লবণাক্ততা বেশি হয়ে গেছে।
মৃত্তিকা বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জি এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃষিজমির লবণাক্ততা বাড়ছে খুলনাঞ্চলের নদ-নদীতে। তার প্রভাব পড়ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার ফসলী জমিতে। তাই ফসল উৎপাদন ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। লবণাক্ততা বাড়তে থাকলে কৃষি আয় বছরে ২১ শতাংশ কমে যাবে। উপকূলীয় অঞ্চলের ৪০ শতাংশ কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়বে। এতে এ অঞ্চলের দুই লাখ ৪০ হাজার কৃষকের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া এই অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত। এ পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করাও খুব ক্ষতিকর। মানুষ বাধ্য হয়ে এই পানি পান করে।