বি এম রাকিব হাসান, খুলনা: বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা যেন সোনার হরিণ। ডাক্তার, নার্স ও দালালদের দৌরাত্ম্যে জিম্মি হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালের রোগীরা। এখানে চিকিৎসা সেবার নামে চলমান নৈরাজ্য ও নির্মমতা যেন দেখার কেউ নেই। হাসপাতালগুলোতে আসা রোগীদের দুর্ভোগ নিত্যা দিনের ঘটনা। পাশাপাশি খুলনাঞ্চলের বেশিরভাগ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নেই। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ক্লিনিকগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। এ সুযোগে অধিকাংশ ডাক্তারদের ছত্রছায়ায় বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বাণিজ্য জমে উঠেছে।
বিভাগীয় শহর খুলনার আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালে আমজনতার চিকিৎসা সেবা চরমভাবে ভূলন্ঠিত। মাসের পর মাস অপারেশন হচ্ছে না। হার্ট কিডনি কিম্বা নিউরোলজির মুমর্ষ রোগীরা আবু নাসের হাসপাতালে ২-৩ মাসের ভর্তির সিরিয়াল পাচ্ছে না। গর্ভবর্তী মায়েরা হাসপাতালের বারান্দায় ফ্লোরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অযতœ অবহেলায় দিন কাটাচ্ছে। আর খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ২৫টি উপজেলাগুলোর মধ্যে ১৭ টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিন বিকল। কোনও কোনও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে মেশিন চালানোর টেকনিশিয়ান নেই। এক্সরের পাশাপাশি অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিও বিকল হয়ে আছে বেশিরভাগ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এ কারণে বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে তৃণমূলের মানুষেরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সূত্রমতে, হাসপাতালসমূহে শুধু ডাক্তার সংকট নয় বরং সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ অন্যান্য বিভাগে লোকবলের চরম সংকট। জেলা সদর ও উপজেলার বেশিরভাগ হাসপাতালে এক্স-রে, মেশিন, ডেন্টাল যন্ত্রপাতি, প্যাথলজিস্ট যন্ত্রপাতি, হার্ট বিভাগের যন্ত্রপাতি ইত্যাদিসহ বহু মূল্যবান চিকিৎসা সামগ্রী ব্যবহারের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার আশায় আগত সাধারণ মানুষ ওই সমস্ত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে, সুযোগ-সুবিধাহীন সরকারি হাসপাতাল গুলোতে একশ্রেণির ডাক্তার, নার্স, আয়া-কর্মচারীর চরম দুর্ব্যবহারের শিকার হন উপকুলীয়াঞ্চল থেকে সহজ সরল রোগীরা। ভর্তি হওয়া রোগীসহ অন্যান্য রোগীরা পর্যাপ্ত ঔষধ থাকা সত্তেও সঠিকভাবে ঔষধ পায় না। ডাক্তারদের লেখা স্লিপ নিয়ে ঔষধ আনতে গেলেই ২/১টা সস্তা ঔষধ দিয়ে বলা হয়, বাকীগুলো স্টোরে নেই তাই বাহির থেকে কিনতে হবে।
বিভাগীয় শহর খুলনার সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল এবং সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও বাগেরহাট সদর হাসাপাতালের অবস্থা আরো করুন। দূর দূরান্ত থেকে আশা নিয়ে আসা হাজার হাজার হতদরিদ্র রোগীকে চরম বিড়ম্বণার শিকার হতে হয়। পদে পদে তারা শুধু নিগৃহিতই হতে থাকে। হাসপাতালের প্রবেশ গেট থেকে শুরু করে কেবিন, বেড পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এক শ্রেণির দালাল। নানা প্রলোভন, যেমন দ্রুত ডাক্তার সেবা পাইয়ে দেয়া, প্রয়োজনীয় ঔষধ, থাকার জন্য কেবিন ইত্যাদি দেখিয়ে তারা দরিদ্র ও সহজ সরল রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এক রকম সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে। এদের খপ্পরে পড়ে অনেকেরই চিকিৎসা সেবা তো দূরের কথা উল্টো দ্বিগুণ অসুস্থ হয়ে কখনো হাসপাতালের বারান্দায়ও শুয়ে কাতরাতে দেখা যায়।
থুকড় গ্রামের এস এম হায়দার আলী অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালগুলোতে চলেছে কমিশন বাণিজ্য। পরিবার পরিজন নিয়ে প্রায়ই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরো বলেন, দালালরা অধিকাংশ সরকারি ডাক্তারদের দ্বারা নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রিত আর রোগী প্রতি এসব দালালদের ডাক্তাররা কমিশন দিয়ে থাকে। রোগী দেখার সময় দেখা যায় তাদের বিভিন্ন রকম মিটিং থাকে। দূর দূরান্ত থেকে রোগীরা এসেও ডাক্তারের দেখা পায়না।
মানবাধিকার কর্মী বটিয়াঘাটার শামিম সরদার জানান, হাসপাতালে রোগীর থেকে ওষুধ কোম্পানীর এজেন্টদেরই গুরুত্ব বেশি। ফলে মুমর্ষ রোগী সিরিয়ালে বসিয়ে রেখে এজেন্টদেরকে ডাক্তাররা অধিক সময় দিয়ে থাকেন। আর পরে রোগীদেরকে যথেচ্ছারভাবে দেখে এক মিনিটেই বিদায় দেন।
ডুমুরিয়ার গুটুদিয়ার ভুক্তভোগী সাদিয়া আক্তার জানান, দামী গিফট কিংবা বড় ধরনের সুবিধা পাওয়ার আশায় অনেক সময় ওই সব প্রতিনিধির সাথে ডাক্তারদের গল্প ও আলাপ-চারিতায় মেতে উঠতে দেখা যায়। ডাক্তারদের অবহেলা ও অনুপস্থিতির সুযোগে নার্স, ওয়ার্ড বয় ও আয়ারাই হয়ে উঠে সর্বেসর্বা।