খোরশেদ আলম সীমান্তঃ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে মোহাম্মদপুর কলেজ গেট এলাকার মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারসহ আশপাশের এলাকায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে ভুয়া চিকিৎসক, চিকিৎসকবিহীন এনআইসিইউ এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যসহ ভয়াবহ সব অনিয়ম ধরা পড়ায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসক ছাড়াই চলছে এনআইসিইউ!
মঙ্গলবার মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে অবস্থিত টিজি, যমুনা, প্রাইম, রেডিয়াম, ব্লাড ব্যাংক ও ঢাকা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে ঝটিকা সফর করেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। অভিযানে দেখা যায়, টিজি হাসপাতালে কোনো দায়িত্বরত চিকিৎসক নেই, এমনকি রোগীদের ব্যবস্থাপত্রেও ছিল না কোনো স্বাক্ষর। অথচ স্পর্শকাতর এনআইসিইউ বিভাগে চারটি শিশু ভর্তি রয়েছে, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে এভাবে শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সাঁড়াশি অভিযানে মন্ত্রী: ডক্টরস কেয়ার সিলগালা
এর আগে সোমবার (২৩ মার্চ) বিকেলে কলেজ গেট এলাকার ‘ডক্টরস কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক’-এ আকস্মিক হানা দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। সেখানে ভুয়া চিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার পরিচালনার প্রমাণ পাওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করার নির্দেশ দেন।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রী দৈনিক জনতাকে বলেন,”পুরো হাসপাতালটি একটি অসাধু চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম রোধে তদারকি জোরদার করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”দৈনিক জনতাকে তিনি আরও জানান, রাজধানীসহ সারা দেশে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং এরপর শ্যামলী ও আসাদগেট এলাকায় বিশেষ তদারকি চালানো হবে।
সরকারি হাসপাতাল ঘিরে দালালদের মরণফাঁদঃ
দৈনিক জনতার অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেরেবাংলা নগর এলাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয়। ভোর হতেই ভুয়া আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে তারা সরকারি হাসপাতালের সামনে ওত পেতে থাকে। এরপর উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যায় মোহাম্মদপুরের বাবর রোড ও হুমায়ুন রোড এলাকার তথাকথিত প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এই এলাকায় প্রায় অর্ধশত নামসর্বস্ব হাসপাতাল দালালদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। একেকটি প্রতিষ্ঠানে ৭-৮ জন দালাল দুই শিফটে রোগী ধরার কাজ করে। তালিকায় নাম আসা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
* ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল
* বেবি কেয়ার এন্ড জেনারেল হাসপাতাল
* সিটি কেয়ার ও প্রাইম জেনারেল হাসপাতাল
* মেডি ফেয়ার ও সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল
* আধুনিক, সন্ধি, পিপলস ও ঐতিহ্য (ওডিসি) ডায়াগনস্টিক সেন্টার
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগরের সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে রোগী ভাগিয়ে নিতে না পারলে এসব ক্লিনিক একদিনও টিকতে পারত না। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের পকেট কাটাই এদের মূল লক্ষ্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দৈনিক জনতাকে মুঠোফোনে জানান, অনিয়ম শনাক্ত হওয়া ৫টি হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জনস্বার্থে এই অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।