ঈদের ছুটি শেষ, ঢাকায় এখনো পুরোপুরি ফেরেনি কর্মচাঞ্চল্য

প্রকাশিতঃ মার্চ ২৪, ২০২৬, ১০:৪০

জাহাঙ্গীর খান বাবু: পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি কাটাতে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছুটে গিয়েছিলেন নগরবাসী। সেই ছুটির রেশ এখনো কাটেনি। সরকারি ছুটি শেষ হয়ে মঙ্গলবার অফিস খুললেও রাজধানী এখনো পুরোপুরি কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠেনি। সড়কে যানবাহনের চাপ কম, অফিসপাড়ায় উপস্থিতি তুলনামূলক কম, আর অনেক মার্কেট এখনো বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার আশেপাশের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ঈদের পরের কয়েকদিন রাজধানীর চিত্র থাকে ভিন্ন। প্রতিবারের মতো এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতে যানজট নেই বললেই চলে। গণপরিবহন স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রী সংখ্যা তুলনামূলক কম। অফিস-আদালত খুললেও অনেক কর্মজীবী মানুষ এখনো গ্রামেই অবস্থান করছেন। ফলে রাজধানীর কর্মচাঞ্চল্যে একটি স্বাভাবিক বিরতি তৈরি হয়েছে।
ঢাকার বাইরে বিনোদনকেন্দ্রে ভিড়
ঈদের আনন্দ উদযাপনে রাজধানীর আশেপাশের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, গাজীপুরের বিভিন্ন রিসোর্ট, নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্ক, কেরানীগঞ্জের পদ্মা রিসোর্টসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসছেন মানুষ। ঈদের ছুটির শেষ দিকে এসে এসব স্থানে ভিড় আরও বেড়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার ঈদের ছুটি তুলনামূলক দীর্ঘ হওয়ায় মানুষ বেশি সময় নিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে দূরে না গিয়ে কাছাকাছি জায়গায় একদিন বা দুদিনের জন্য ঘুরতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এতে করে রাজধানীর আশেপাশের বিনোদন কেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে।
রাজধানীতে আংশিক স্থবিরতা
মঙ্গলবার অফিস খোলার পরও রাজধানীতে পুরোপুরি কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়নি। সচিবালয়, বিভিন্ন বেসরকারি অফিস ও ব্যাংকে উপস্থিতি কম। অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে কার্যক্রম চালালেও পূর্ণ গতিতে কাজ শুরু হয়নি। কর্মজীবী মানুষের বড় একটি অংশ এখনো গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদযাপন করছেন।
বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টার সূত্রে জানা গেছে, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ঢাকামুখী মানুষের চাপ বাড়তে শুরু করবে। ট্রেন, বাস ও লঞ্চে ফিরতি যাত্রার টিকিটের চাহিদা বাড়ছে। তবে এখনো বড় ধরনের ভিড় দেখা যায়নি।
মার্কেট এখনো পুরোপুরি খোলেনি
ঈদের আগে টানা ব্যস্ততার পর রাজধানীর বেশিরভাগ মার্কেট এখনো বন্ধ রয়েছে। নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চক, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কসহ বড় বড় শপিংমলগুলো ধীরে ধীরে খুলছে। অনেক দোকানদার এখনো গ্রাম থেকে ফেরেননি।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের পর অন্তত তিন থেকে পাঁচ দিন ব্যবসা প্রায় বন্ধই থাকে। কর্মচারীরা ছুটিতে থাকেন, মালিকরাও বিশ্রাম নেন। ফলে বাজারে স্বাভাবিক ক্রেতা উপস্থিতি ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
গ্রামেই এখনো বেশিরভাগ মানুষ
ঈদ মানেই গ্রামে ফেরা। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজধানীর লাখো মানুষ এবারও গ্রামে গেছেন। তাদের অনেকেই এখনো ঢাকায় ফেরেননি। ফলে রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ অনেকটাই কমে গেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিরতি যাত্রা শুরু হবে মূলত ছুটির শেষ ভাগে। অফিস খোলার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ঢাকায় মানুষের চাপ বাড়বে। তখনই আবার পুরনো ব্যস্ততায় ফিরবে রাজধানী।
কক্সবাজারসহ পর্যটন স্পটে ভিড়
ঈদের ছুটিতে শুধু ঢাকার আশেপাশেই নয়, দেশের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট ও কুয়াকাটায় পর্যটকদের উপচে পড়া উপস্থিতি ছিল।
বিশেষ করে কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্টগুলোতে আগাম বুকিং ছিল প্রায় পূর্ণ। সৈকতে মানুষের ঢল নেমেছে ঈদের দিন থেকে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পর্যটকের সংখ্যা বেশি।
অন্যদিকে দেশের বাইরে ভ্রমণেও আগ্রহ বেড়েছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির অনেকেই থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে ঈদের ছুটি কাটাতে গেছেন। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ কিছুটা কমলেও আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী চাপ বেড়েছে।
অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িক ধীরগতি
ঈদের ছুটির কারণে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িক ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিল্প-কারখানাগুলো ধীরে ধীরে চালু হচ্ছে। ব্যাংকিং লেনদেন সীমিত পরিসরে চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে পুরোপুরি গতি ফিরতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদ পরবর্তী এই সময়টি অর্থনীতির জন্য স্বাভাবিক বিরতি। তবে দ্রুত কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
যানজটমুক্ত ঢাকায় স্বস্তি
ঈদের পর ঢাকার সবচেয়ে বড় স্বস্তির দিক হলো যানজটের অনুপস্থিতি। সাধারণ দিনে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হয়, সেখানে এখন খুব অল্প সময়েই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যাচ্ছে।
রাজধানীবাসীর অনেকেই এই সময়টাকে ‘স্বস্তির ঢাকা’ হিসেবে উপভোগ করেন। যারা ঢাকায় অবস্থান করছেন, তারা তুলনামূলক কম ভিড় ও কম চাপের মধ্যে শহরটিকে নতুনভাবে অনুভব করছেন।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, রাজধানী এখনো ঈদের আমেজে আচ্ছন্ন। অফিস খোলা হলেও পূর্ণ কর্মচাঞ্চল্য ফিরতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। আগামী সপ্তাহের শুরু থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তখনই আবার আগের ব্যস্ত, যানজটপূর্ণ ও কর্মমুখর ঢাকায় ফিরে যাবে নগরজীবন।
ঈদের আনন্দ, ভ্রমণ ও পারিবারিক বন্ধনের এই সময়টি শেষ হয়ে গেলে আবার শুরু হবে কর্মব্যস্ত জীবন। তবে এই স্বল্প সময়ের বিরতিই অনেকের জন্য নতুন করে কাজের প্রেরণা জোগায়—এমনটাই মনে করছেন ।