গাইবান্ধা থেকে মিলন খন্দকার: পবিত্র ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে গাইবান্ধার সাত উপজেলার ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৩ জন দরিদ্র, অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য ৩৫১৬.৪৩ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয় সরকার।
তবে, গরিবদের জন্য বরাদ্দ এই চালে ভাগ বসিয়েছেন বর্তমান সময়ের দুই বড় রাজনৈতিক দল—ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
অভিযোগ অনুযায়ী, উভয় দলই প্রায় ১০ শতাংশ করে মোট ২০ শতাংশ চাল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধেও ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত চাল নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে, যা পুরো বিতরণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অন্যদিকে, গরিবদের ভিজিএফ চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে জেলায় একের পর এক অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও পঁচা চাল বিতরণ, কোথাও নির্ধারিত ১০ কেজির পরিবর্তে ৬ থেকে ৮ কেজি চাল দেওয়া, আবার কোথাও স্লিপ থাকা সত্ত্বেও চাল না পেয়ে চেয়ারম্যানকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।
জেলা জুড়ে গরিবদের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে এতসব নেক্কারজনক ঘটনার পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি জেলা প্রশাসনকে।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এক পত্র সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধার চারটি পৌরসভা ও সাত উপজেলার ৮১ টি ইউনিয়নের জন্য ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৩ টি কার্ডের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়
৩৫১৬.৪৩ মেট্রিক টন চাল ।
ভাগ বসানো উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে একটি সদর উপজেলা। ১৩ টি ইউনিয়নের জন্য এ উপজেলায় ৫৭৮০৯ কার্ডের বিপরীতে বরাদ্দ ৫৭৮.০৯০ মেট্রিক টন চাল। যার মধ্যে বোয়ালী ইউনিয়নে কার্ড বরাদ্দের পরিমাণ ৫৬০০। এই ৫৬০০ কার্ডের মধ্যে ২০% অর্থাৎ ১১২০ টি কার্ড নেয় বিএনপি ও জামায়াত এবং ২% অর্থাৎ ১১২ কার্ড নেয় উপজেলা প্রশাসন।
ভাগ বসানো উপজেলা পরিষদের মধ্যে আরেকটি উপজেলা সাদুল্লাপুর। এই উপজেলা প্রশাসন ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ থেকে ৫% পর্যন্ত কার্ডের ভাগ নিয়েছেন।
সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ থেকে বিএনপি ১০%, জামায়াত ১০% এবং উপজেলা প্রশাসন নিয়েছেন ৫% কার্ড।
অর্থাৎ—পরিষদের মোট ৩৫৮১ কার্ড থেকে ৭১৬টি কার্ড গেছে দলীয় ভাগে, ১৭৯টি নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
বনগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা ১১ মার্চ চাল বিতরণ করেছি। পরিষদের বরাদ্দ থেকে বিএনপি ১০%, জামায়াত ১০% এবং উপজেলা প্রশাসন নিয়েছেন ৫% কার্ড। এসময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউএনও স্যার সব কার্ড সাংবাদিক ও ট্যাগ অফিসারদের দিয়েছেন বলে শুনেছি।
এছাড়া ভাগ বসানো আরেকটি উপজেলা গোবিন্দগঞ্জ। গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদে বরাদ্দ ছিলো ৩৮৯০ টি কার্ড। এরমধ্যে ৯% বিএনপি, ৯% জামায়াত এবং ২% উপজেলার অর্থাৎ ৭০০ টি কার্ড গেছে রাজনৈতিক ভাগে, ৭৮টি গেছে প্রশাসনের অংশে। মোট ৭৭৮ কার্ড মূল তালিকা থেকে বাইরে গেছে।
মহিমগঞ্জ ইউপি সচিব আব্দুল জব্বার প্রধান বলেন, আমার ইউনিয়নে বরাদ্দ ৩৮৯০ কার্ড। এরমধ্যে থেকে ৯% বিএনপি ও ৯% জামায়াতকে দেওয়া হয়েছে। এবং ২% নিয়েছে উপজেলা।
এ ব্যাপারে সদর পিআইও অফিসের সাব এসিস্ট্যান্ট ইন্জিনিয়ার জুবায়ের রহমান বলেন, ২% নেওয়া হয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু ওনারা (ইউএনও) নেয়নি। সিদ্ধান্ত যেটা হয়েছে যে, সরকার দলীয় যারা আছে, স্থানীয় এমপি যারা আছেন-চেয়ারম্যানরা সব নাম দিলে তারা বঞ্চিত হয়। সেক্ষেত্রে স্ব স্ব ইউএনও তাদের সাপোর্টে আছেন। তারা নামগুলো সেখানে পাঠাইছেন। আবার কেউ সুপারিশ করলে চেয়ারম্যান হয়তো সেটা দেয়না, তখন আমরা সেটা বলে দেই।
এ্যাপারে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাইলাতুল হোসেন বলেন, বিষয়টি সেরকম নয়। নেওয়া হয়েছে ঠিক আছে কিন্তু সেসব আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষের জন্য।
এসময় তিনি বলেন, ইউএনও কাদের জন্য নিবেন? এখানে ইউএনওর কেউ নেই। নেওয়া হয়েছে আশ্রয়নে আশ্রিতদের জন্য।
এ সময় দলীয় ও প্রশাসনের নেওয়ার নিয়ম আছে কি-না এবং আশ্রয়ণতো ইউপির আওতায়-তাহলে আলাদা নিতে হলো কেন? এমন প্রশ্নের অর্ধেক উত্তর এড়িয়ে গিয়ে ফোন কেটে দেন ইউএনও।
এদিকে, ঈদের চাল গরীবের মাঝে ১২ মার্চের মধ্যে বিতরণের কথা বলা হলেও নানা কারণে ৯৮ ভাগ পরিষদ তা করতে পারেনি। কেউ ১৯ মার্চেও চাল বিতরণ করেছেন। জেলায় সর্বশেষ চাল বিতরণ করেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদ।
অভিযোগ রয়েছে, সাপমারা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক সারোয়ার হোসেন চৌধুরী দলীয় অংশ ২০ ভাগ ৫৫৮ টি কার্ড নেওয়ার পরও চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বরাদ্দে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি চেয়ারম্যানের থেকে ২০০ এবং প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে ২০টি করে স্লিপ জোরপূর্বক নেন। পাশাপাশি ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য সুমি আক্তার, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ফরিদা বেগম এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০টি করে মোট আরও ৩০০টি স্লিপ দাবি করেন। তাতে সফল না হলে পরিষদে গিয়ে হট্টগোল করে চাল বিতরণ বন্ধ করে দেন। এর ফলে গত (১৮ মার্চ) গভীর রাতে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, উপস্থিত জনতার সামনে চেয়ারম্যান আবু তালেব মন্ডল হাউমাউ করে কাঁদছেন এবং ভিজিএফ বিতরণে বাঁধার কথা তুলে ধরেন।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু তালেব মন্ডল বলেন,
বিষয়গুলো জানাজানি হলে পরে প্রশাসন ও কিছু রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় চাল বিরতণ করি কিন্তু শেষ করতে পারিনি। আজও (১৯ মার্চ) ১৪২ বস্তা চাল বিতরণ করতে হবে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক সারোয়ার হোসেন চৌধুরী।
এছাড়া ১৫ মার্চ রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামের মো. আবদুল মজিদ মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। এ সময় বাড়ির একটি ঘর থেকে অবৈধভাবে মজুদ রাখা ভিজিএফের ৭২ বস্তা চাল জব্দ করা হয়। ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন। পরে ১৭ মার্চ ৫ থেকে ৬ জন অজ্ঞাত নামা আসামীসহ বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য ভিজিএফের চাল অবৈধ মজুত ও সহায়তার অপরাধে দিনমজুর মো. আবদুল মজিদ মিয়ার (৩৭) বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। জেলায় এতসব ঘটনার পরে ভিজিএফ নিয়ে এটিই প্রথম আইনগত ব্যবস্থা।
এছাড়া (১৩ মার্চ) দুপুরে সুন্দরগঞ্জের শান্তিরাম ইউনিয়ন থেকে ভিজিএফের ১০ বস্তা চাল কালোবাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় আটক করে পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ ছিলো, চালগুলো পরিষদের চেয়ারম্যানের নির্দেশে ভুট্টু ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং শত শত মানুষ ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে জড়ো হয়ে চালগুলো আটক করে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এছাড়াও (১৫ মার্চ) দুপুরে পলাশবাড়ীতে স্লিপ থাকা সত্ত্বেও চাল না পাওয়া , কম পরিমাণ চাল বিতরণ এবং মহদীপুর ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চাল বিক্রির অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তারা অভিযোগ করেন, অসহায় ও দুস্থদের মাঝে ১০ কেজি করে ভিজিএফের চাল বিতরণের কথা থাকলেও শনিবার চাল বিতরণের সময় অনেক সুবিধাভোগীকে ১০ কেজির পরিবর্তে মাত্র ৬ কেজি করে চাল দেন।
পরে একই বিষয় নিয়ে পরদিন ১৬ মার্চ আবারো মহাসড়কে যানবহন আটকে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন বঞ্চিতরা। পরে “অবরোধের খবর পেয়ে এসিল্যান্ড গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে সাদুল্লাপুর ইউএনও মাহমুদুল হাসানের সাথে যোগযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
এছাড়া একাধিকবার ফোন করলেও ফোন রিসিভ করেননি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা। এমনকি তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসূদূর রহমান মোল্লা বলেন, এরকম হয়ে থাকলে প্রত্যেকটি বিষয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।