ঈদযাত্রায় স্বস্তি: কমলাপুরে ঘরমুখো মানুষের ঢল, সড়কপথেও নেই ভোগান্তি

প্রকাশিতঃ মার্চ ১৮, ২০২৬, ০৯:৩৮

জাহাঙ্গীর খান বাবু: পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন লাখো মানুষ। কয়েক দিন ধরেই শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা, আর ঈদের মাত্র দুই দিন বাকি থাকায় এই যাত্রা এখন চূড়ান্ত ব্যস্ততায় পৌঁছেছে। রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে—যাত্রীদের ব্যাপক ভিড় থাকলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক রয়েছে। ট্রেন ও বাস নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বুধবার (১৮ মার্চ) সকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনের ভেতর-বাইরে মানুষের ঢল নেমেছে। টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন, প্ল্যাটফর্মজুড়ে অপেক্ষমাণ যাত্রী এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বিদায়ের আবেগ—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে এই উৎসবের সঙ্গে রয়েছে ব্যস্ততা ও সতর্কতার ছাপও।
অনেক যাত্রীই ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই স্টেশনে এসে অবস্থান নিচ্ছেন, যাতে কোনো ধরনের ঝামেলা বা ভিড়ের কারণে ট্রেন মিস না হয়। এতে করে স্টেশনে চাপ বাড়লেও যাত্রীরা কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে বেনাপোলগামী রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে গেছে। এর পরপরই জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস, নকশিকাঁথা এক্সপ্রেস, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জ কমিউটার ট্রেন এবং মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন ধারাবাহিকভাবে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো ট্রেনের শিডিউলে বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেনি।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভিড় থাকলেও তারা স্বস্তিতে আছেন। সিলেটগামী যাত্রী তাসনিম শুভ্রা বলেন, “ঈদের সময় ট্রেন মিস হওয়ার ভয় থাকে, তাই আগে থেকেই চলে এসেছি। ভিড় অনেক বেশি, তবে পরিবেশ ভালো লাগছে। আশা করি নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছাতে পারব।”
খুলনাগামী যাত্রী রবিউল ইসলাম জানান, “শেষ সময়ে টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আজও আগে ভাগে চলে এসেছি। ভিড় থাকলেও সবাই মোটামুটি শৃঙ্খলা মেনে চলছে।”
মোহনগঞ্জগামী আশিকুর রহমান বলেন, “আমার ট্রেন দুপুর ১টায়, কিন্তু আমি আগেই চলে এসেছি। বন্ধুরাও এসেছে, আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছি। এরপর একসঙ্গে বাড়ির পথে রওনা দেব।”
কমলাপুর স্টেশনের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক এবিএম কামরুজ্জামান বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হয়নি। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। যাত্রীর চাপ বেশি থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
স্টেশনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও চোখে পড়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম ও প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
অন্যদিকে সড়কপথেও ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বুধবার গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “সব বাস কাউন্টার থেকে নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ভোগান্তি বা অভিযোগ আমরা পাইনি।”
তিনি আরও বলেন, “কিছু পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ২০-৩০ টাকা কম নিচ্ছে। এখানে পুলিশ বুথ রয়েছে। কেউ বাড়তি ভাড়া নিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাসগুলোও নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে।”
গাবতলী এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, যাত্রীদের ভিড় থাকলেও বাস ছাড়ার ক্ষেত্রে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। যাত্রীরা শৃঙ্খলার সঙ্গে টিকিট সংগ্রহ করে বাসে উঠছেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সবাই ছুটছেন নিজ নিজ গন্তব্যে।
যানজট পরিস্থিতি সম্পর্কেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “রাস্তায় বড় কোনো যানজট নেই। যাত্রীরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছেন। কোথাও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার খবর পাওয়া যায়নি।”
জ্বালানি সংকট নিয়ে যেসব আশঙ্কা ছিল, তাও অনেকটাই কেটে গেছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, “১৫ তারিখ রাত ১১টা থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। যমুনা সেতু দিয়ে গতকাল ৩২ হাজারের বেশি যানবাহন পার হয়েছে। তারা জ্বালানি পেয়েছে বলেই চলাচল করতে পারছে। কেউ জ্বালানি না পেলে অভিযোগ করতে পারবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদযাত্রা আগের তুলনায় বেশি পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি তুলনামূলক কম হয়েছে। রেল ও সড়ক—উভয় খাতেই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে সময়সূচি ঠিক রাখা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
সব মিলিয়ে রাজধানী ছাড়ার এই ব্যস্ত সময়ে মানুষের ঢল থাকলেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ভোগান্তির চিত্র নেই। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঘরমুখো মানুষের এই যাত্রা এবার অনেকটাই স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, ঈদের আগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই ধারা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।