নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষ

প্রকাশিতঃ মার্চ ১৭, ২০২৬, ১৪:৫৯

সফিকুল ইসলাম: দেশজুড়ে উদযাপিত হবে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে টানা সাতদিনের ছুটি। এরইমধ্যে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাখ লাখ মানুষ স্বস্তিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাড়ি ফিরেছেন নাড়ির টানে। এতে সড়ক-নৌ-রেলপথে ঘরমুখো মানুষের প্রচুর চাপ বাড়ছে। তিনপথেই বইছে ঘরমুখো জনস্রোত। এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক-নৌ ও রেলপথ কোথাও দুর্ভোগ নেই। তবে এই স্বস্তির ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের অভিযোগ বাড়তি ভাড়া আদায় করছে পরিবহন মালিকরা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সায়েদাবাদ-গুলিস্তানসহ দূরপাল্লার বাসস্ট্যান্ড, কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সরেজমিন ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন চিত্র।
ঘরমুখো মানুষের অভিমত, উৎসবপাগল বাঙালিরা ঈদযাত্রায় স্বস্তি পাওয়ায় বর্তমান সরকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, ঈদে ফেরার সময়েও সরকারের কার্যকর তদারকি থাকলেও কোনো ভোগান্তি হবে না। পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্টদের আরও আন্তরিক হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন যাত্রীরা। তবে রাজধানীর সায়েদাবাদ টার্মিনাল এলাকায় বাস কাউন্টার ও আশপাশের এলাকা ঘুরে সাধারণ সময়ের মতোই যাত্রীদের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়লেও রাজধানীর সায়েদাবাদে ঘরমুখো যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ নেই। তবে কোথাও জনস্রোত আর কোথাও কোথাও ভিড় কম দেখা যায়। একই চিত্র ছিল কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চস্টেশনে।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বাস ও লঞ্চ-রেলওয়ে টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, এদিন বিকালে রাজধানী ছেড়ে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। ঢাকার বিভিন্ন সড়ক ও বাস টার্মিনালে বেড়েছে যাত্রীর চাপ। যাত্রাবাড়ী-দোলাইরপাড়-পোস্তগোলা মহাসড়কজুড়ে দক্ষিণবঙ্গগামী যাত্রীদের যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও দোলাইরপাড় বাস কাউন্টারে টিকিট সংকট ও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। সরকারি কর্মচারীদের ঈদের ছুটি শুরু হলেও রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে এখনো দেখা মেলেনি ঘরমুখো যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ। ফলে নির্বিঘ্নেই বাড়ির পথে রওনা হতে পারছেন যাত্রীরা। গতকাল মঙ্গলবার টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। যাত্রীরা জানান, চাহিদার তুলনায় বাসের সংখ্যা বেশি থাকায় সহজেই গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। যাত্রীচাপ কম থাকায় ভাড়াও স্বাভাবিক রয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ গুণতে হচ্ছে না। তাই এবারের ঈদযাত্রার শুরুটা স্বস্তিদায়ক ও ভোগান্তিহীন বলেই মনে করছেন তারা। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মামুন হাসান বলেন, এবার মানুষের চাপ তুলনামূলক কম। বাসও সহজে পাওয়া যাচ্ছে, ভাড়াও আগের মতোই রয়েছে। ঢাকা-কুমিল্লা রুটে চলাচলকারী তিশা পরিবহনের চালক আল আমিন বলেন, এবার যাত্রীর চাপ কম। ভাড়াও বাড়েনি, আগের মতোই রয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ছুটির কারণে যাত্রীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। তবে ২৮ ও ২৯ রমজানের দিকে যাত্রীসংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। কেউ কেউ দ্রুত বাস পেয়ে স্বস্তি নিয়ে রওনা দিলেও অনেককে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। ঈদের এই মৌসুমে দূরপাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। বিশেষ করে এসি ও স্লিপার কোচগুলোতে ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। ঢাকা-সাতক্ষীরা রুটে ১,০০০ টাকার এসি টিকিট ১,৬০০ থেকে ২,২০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নন-এসি বাসেও নির্ধারিত ভাড়া অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদের চাপে বাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু পরিবহন এই সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে। তবে বাস মালিক সমিতির দাবি, তারা নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কিছু নিচ্ছে না এবং বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগকে তারা সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রীর চাপের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক চালক ও হেলপার জানিয়েছেন, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাস ছাড়তে দেরি হচ্ছে এবং ট্রিপ সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। ঢাকা-নোয়াখালী রুটের এক বাসচালক বলেন, তেল নিতে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ায় নির্ধারিত ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে যাত্রীদের চাপ বাড়ছে এবং সামগ্রিকভাবে ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
ঈদযাত্রার প্রথম দিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়লেও কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই গন্তব্যে যাচ্ছেন যাত্রীরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে মহাসড়কে গাড়ির চাপ লক্ষ্য করা গেছে। তবে কোনো যানজট বা ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়নি দেশের লাইফলাইন এই মহাসড়কে। মহাসড়কে চলাচলকারী বাসের যাত্রী এবং চালকরা জানিয়েছেন একটি ভোগান্তিহীন প্রাণবন্ত ঈদযাত্রা করতে পারছেন তারা। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় ছেড়ে আসা এশিয়া এয়ারকন নামের একটি বাসের যাত্রী আসাদুল ইসলাম বলেন, ঢাকার ভেতরে সামান্য একটু জ্যামে পড়েছিলাম। ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর কোনো জ্যাম নেই। কুমিল্লায় আসতে আড়াই ঘণ্টার মতো সময় লেগেছে। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় আসা তিশা বাসের যাত্রী কাইমুল হক নামে এক যাত্রী বলেন, মহাসড়কে কোনো যানজটের চিহ্ন নেই। খুবই স্বস্তিতে কুমিল্লায় এসেছি কম সময়ের মধ্যে। তবে হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মানুষের ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কের ২৭টি ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে তাতে নিরাপত্তা জোরদার করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে হাইওয়ে থানা পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম বলেন, মহাসড়কে দুই সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য কাজ করছে। আজ ঈদযাত্রার প্রথমদিন কোনো ভোগান্তির অভিযোগ শুনিনি এখনো। আশা করছি পুরো ঈদযাত্রা স্বস্তির হবে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে রাজধানীর গাবতলীতে দেখা গেছে, গাবতলী বাস টার্মিনালে নেই যাত্রীদের ভিড়। অনেকটাই ফাঁকা বাস কাউন্টারগুলো। কোনো কোনো কাউন্টারের সামনে গাড়ির অপেক্ষায় বসে সময় কাটাচ্ছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা। কেউ কেউ আবার কাউন্টারগুলোতে গন্তব্যের টিকিট খুঁজতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাউন্টারে দায়িত্বরত পরিবহন শ্রমিকেরা হাঁক-ডাক দিয়ে যাত্রী খুঁজছেন। এছাড়াও সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের গাবতলী বাস টার্মিনাল কেন্দ্রিক সড়ক যানজটমুক্ত করতে কাজ করছেন। একইসঙ্গে টার্মিনালে র‌্যাব ও পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নজরদারি করতে দেখা গেছে। সূর্যমূখী পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার সারওয়ার বলেন, আপনি দেখেন এখানে বেশিরভাগ বাস কাউন্টার এখন ফাঁকা পড়ে আছে, যাত্রী নেই। পদ্মা সেতু হওয়ার পরে আমার এখানে যাত্রীর সংখ্যা একেবারে কমে গেছে। আমাদের পরিবহন শ্রমিকরা ডেকেও যাত্রী পাচ্ছেন না। রাবেয়া পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার কাইয়ুম বলেন, যাত্রী নেই। আবার গাড়িও নেই। সকাল থেকে মাত্র ৫টা গাড়ি ছেড়ে গেছে। সকালে কিছু যাত্রী ছিল। কাউন্টার এখন ফাঁকা। স্টাফরা ঝিমাচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার সাথে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে এ নৌরুটে যানবাহনের চাপ কমলেও ঈদ মৌসুমে তা বেড়ে যায়। তারপরও পর্যাপ্ত ফেরি চলাচল করায় বিগত বছরের ঈদগুলোতে ঘাট এলাকায় যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও ভোগান্তি হয়নি। তবে এবারের ঈদযাত্রায় ঘাট এলাকায় পন্টুনের অ্যাপ্রোচ রাস্তার মেরামত ভালো না হওয়ায় ফেরি থেকে গাড়ি লোড-আনলোডে সময় বেশি লাগায় ভোগান্তি বাড়ছে।
রাজধানীর বছিলায় নবনির্মিত লঞ্চঘাটে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত বছিলা লঞ্চঘাট থেকে প্রতিদিন ছয়টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে। এতে করে সদরঘাটকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে সোমবার ১৬ মার্চ এই লঞ্চঘাটের উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর নৌপথে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় উপচে পড়া ভিড়ের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। সেই চাপ কমাতেই বিকল্প হিসেবে বছিলা লঞ্চঘাট চালু করা হয়েছে।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শুরু হওয়া ছুটিতে রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় শুরু হয়েছে। কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ট্রেন ছাড়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। তবে এদিন ভোর থেকেই কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের উপচে পড়া উপস্থিতি। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে বাড়ির পথে ছুটছেন তারা। ভিড় সামাল দিতে স্টেশনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ট্রেন কানায় কানায় পূর্ণ থাকলেও নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে। এতে যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দ লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ ভোগান্তির শঙ্কা থাকলেও সময়মতো ট্রেন চলাচল স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে ঈদযাত্রীদের জন্য। মঙ্গলবার ঢাকা থেকে ট্রেন হিসেবে দুপুর ১২:১৫ মিনিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী রাজশাহী কমিউটার ছেড়ে যায়। এরপর পর্যায়ক্রমে নারায়ণগঞ্জগামী নারায়ণগঞ্জ কমিউটার, মোহনগঞ্জগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস,চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী বনলতা এক্সপ্রেস,চট্টগ্রামগামী চট্টলা এরাপ্রেস,এবং রাজশাহীগামী সিঙ্ক সিটি নির্ধারিত সময়েই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের ক্ষেত্রে কয়েক ধাপে টিকিট যাচাই করা হচ্ছে।