# মধ্যপ্রাচ্য ছেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিক
# দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলা, বাংলাদেশিসহ আহত ৪
# মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ২০ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত
# ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আহত হলেও সুস্থ ও নিরাপদ আছেন
# হাইফায় একের পর এক তেলশোধনাগারে হামলা ইরানের
# মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি ব্যাংকে হামলার হুমকি ইরানের
# রিজার্ভ করে রাখা তেল ছাড়তে প্রস্তুত জি-৭
জনতা ডেস্ক: পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালিতে পরপর তিনটি কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে কে বা কারা এই হামলা চালিয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। অজ্ঞাত বস্তুর (প্রজেক্টাইল) আঘাতে তিন জাহাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা— ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি (ইউকেএমটিও) বলেছে, গতকাল বুধবার হরমুজ প্রণালিতে অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ওমান উপকূলের প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল উত্তরে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘মায়ুরি নারি’ হামলার শিকার হয়েছে। এতে জাহাজটি আগুন ধরে যায়।
থাইল্যান্ডের পরিবহন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে অজানা প্রজেক্টাইলের আঘাতে আগুলা লাগার পর থাই জাহাজ ‘মায়ুরি নারি’ থেকে ২০ জন ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে, তবে তিনজন ক্রু এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। মন্ত্রণালয় বলছে, ক্রুরা জাহাজটি একটি লাইফবোটে আশ্রয় নেন, পরে ওমানি নৌবাহিনী তাদের উদ্ধার করেছিল। উদ্ধার হওয়া ক্রুরা জানিয়েছে, জাহাজের পিছনে একটি বিস্ফোরণ ঘটে এবং ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়, সেখানে নিখোঁজ তিনজন ক্রু সদস্য কাজ করছিলেন।
এর আগে ইউকেএমটিও জানিয়েছিল, জাপানের পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ ‘ওয়ান ম্যাজেস্টি’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহর ২৫ নটিক্যাল মাইল (৪৬ কিলোমিটার) উত্তর-পশ্চিমে অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দু’টি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানায়, জাহাজটির নাবিকরা সবাই নিরাপদ আছেন এবং জাহাজটি নিরাপদ নোঙরস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে মেরিটাইম ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ভ্যানগার্ড টেক বলেছে, দুবাইয়ের প্রায় ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী ‘স্টার গুইনেথে’ নামে আরেকটি বাল্ক ক্যারিয়ার আঘাত হানে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল। এতে জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে নাবিকরা নিরাপদ আছেন। ইউকেএমটিও বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকে আরব উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিসহ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আজকের তিনটি নিয়ে মোট ১৭টি জাহাজে হামলার খবর পেয়েছে তারা।
বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রাণরেখা হিসেবে বিবেচিত। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি, যার এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান। ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এই সরু পথ দিয়েই চলাচল করে।
বিশ্বের মোট তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০ শতাংশের বেশি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা তেলের প্রায় ৮২ শতাংশ যায় এশিয়ায়, বাকি অংশ ইউরোপে। চীনের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ২৪ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করে; ব্যস্ত সময়ে কখনও কখনও প্রতি ছয় মিনিট পরপর জাহাজ চলতে দেখা যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই কার্যত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে গেছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে দাম হু হু করে বেড়ে গেছে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৪৩ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। গত মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এ তত্য জানান। খবর বিবিসি ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের। তিনি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার জনকে সহায়তা করেছে এ উদ্দেশ্যে গঠিত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স। পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নিতে দুই ডজনের বেশি চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। তবে এসব ফ্লাইট গড়ে ৪০ শতাংশের কম আসন পূর্ণ ছিল, কারণ অনেক মার্কিন নাগরিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যবহার করে নিজ উদ্যোগেই দেশে ফিরেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে দু’টি ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা এক বাংলাদেশি নাগরিকসহ চারজন আহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে দুবাই মিডিয়া অফিস বলেছে, কিছুক্ষণ আগে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একেবারে কাছাকাছি এলাকা দু’টি ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এতে ঘানার দুই নাগরিক ও এক বাংলাদেশি নাগরিক সামান্য আহত হয়েছেন। এছাড়া ভারতীয় এক নাগরিক মাঝারি ধরনের আঘাত পেয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এই হামলার পরও বিমানবন্দরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। পৃথক বিবৃতিতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘চারজন কর্মী আহত হয়েছেন এবং তাদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণের কারণে বেশিরভাগ টার্মিনাল থেকে আগেই যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও যাত্রীদের ফ্লাইট নিশ্চিত হওয়ার আগে বিমানবন্দরে না আসতে অনুরোধ করেছে কর্তৃপক্ষ, কারণ যেকোনো সময় ফ্লাইটের সূচী পরিবর্তন হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, ইরানি হামলার ফলে এ পর্যন্ত তিনজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি, একজন পাকিস্তানি এবং একজন নেপালের নাগরিক। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিমান চলাচল ব্যাঘাত ঘটে। পরে কিছু ফ্লাইট পুনরায় চালু করা হলেও এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না এয়ারলাইন্স সংস্থাগুলো। ইসরায়েলের উত্তরপ্রান্তের বন্দর শহর হাইফা লক্ষ্য করে ফের বড় ধরনের হামলা শুরু করল ইরান। গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে এই ইসরায়েলি শহরের তেলপরিশোধনগার এবং মজুতকেন্দ্রগুলিতে ড্রোন হামলা শুরু করেছে তেহরান। ইরানি সেনাদের দাবি, যদিও এই হামলার পর ইরানের কোনও ড্রোন লক্ষ্যে ইসরায়েল আঘাত হানতে পেরেছে কি-না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলে ধারাবাহিক আক্রমণ শুরু করেছে ইরান। লেবাননের দক্ষিণ প্রান্তে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত কয়েক সপ্তাহে হামলা হয়েছে হাইফা শহরকে লক্ষ্য করেও। এবার ফের হাইফা শহরের তেলশোধনাগার এবং মজুতকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা শুরু করল ইরান। গত শনিবার ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করে, তারা তেহরানের বেশ কয়েকটি তেলমজুতকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমও জানায়, তাদের তেলমজুতকেন্দ্রে হামলা হয়েছে।
এপি জানায়, এটিই ছিল সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনও অসামরিক শিল্প স্থাপনার উপর প্রথম হামলা। এর পরেই ইসরায়েলকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দেয় ইরান। ইসরায়েলের বিভিন্ন তেলশোধনকেন্দ্র হামলা চলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ইরানের সামরিক বাহিনী। গত বছর যখন ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘর্ষ বেঁধেছিল, তখনও তেহরান নিশানা করেছিল ইসরায়েলের এই বন্দরশহরকে। ওই সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হানায় হাইফা বন্দরের কাছে একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে আগুন লেগে গিয়েছিল।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুদ্ধে আহত হওয়া সত্ত্বেও ‘নিরাপদ এবং সুস্থ’ আছেন বলে জানিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্টের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান। গতকাল বুধবার টেলিগ্রাম চ্যানেলে এক পোস্টে ইরানের একজন সরকারি উপদেষ্টা পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘আমি খবর পেয়েছি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ আছে আমার এমন কয়েকজন বন্ধু নিশ্চিত করেছেন— আল্লাহর রহমতে তিনি নিরাপদ ও সুস্থ আছেন’। এরআগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ৫৬ বছর বয়সী খামেনিকে ‘রমজান যুদ্ধের আহত সৈনিক’ বলে অভিহিত করে সংবাদে প্রকাশ করে। তবে তিনি কখন বা কি ধরনের আঘাত পেয়েছেন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি তারা। মাত্র তিন দিন আগে ইরানের সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা ও তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরী হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য এবং অবস্থান নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই ইউসুফ পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য এলো। যদিও সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এখনো জনসম্মুখে আসেনি মোজতবা। তিনজন ইরানি এবং দুইজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের জানিয়েছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনেই মোজতবা খামেনি আহত হয়েছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। মঙ্গলবার ইরানের একটি ব্যাংকে হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই হুমকি এলো। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড— খাতাম আল–আনবিয়ার মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি সতর্ক করে বলেছেন, এই অঞ্চলের মানুষদের ব্যাংকগুলোর এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, ব্যর্থ অভিযানের পর সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনী এবং নিষ্ঠুর ইহুদিবাদী ইসরায়েল ইরানের একটি ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মাধ্যমে তারা আমাদের মার্কিন ও ইসরায়েলের অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যকরার স্বাধীনতা দিয়েছে। এরআগে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার তেহরানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সেপাহ ব্যাংকের একটি ভবনে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানের নিউজ চ্যানেল ‘খবর’ এর বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, গত রাতে এক বিমান হামলায় সেপাহ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মী নিহত হয়েছেন। বেতন বিতরণের প্রস্তুতির জন্য ওই কর্মীরা বিশেষ শিফটে কাজ করছিলেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানজুড়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। গতকাল বুধবার মানবিক সংস্থাটি জানিয়েছে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে; চলমান ইসরায়েলি-মার্কিন যুদ্ধে ইরানজুড়ে কমপক্ষে ১৯ হাজার ৭৩৪টি বেসামরিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ এবং সাহায্য কেন্দ্রও রয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৭৭টি চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতালএবং ৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়াও ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ১৬টি সুবিধা মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। এরআগে গতকাল ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে সেমাবার পর্যন্ত কমপক্ষে ১,২৩২ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে যুদ্ধের প্রথম দিনে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জন স্কুলছাত্রী এবং কর্মচারীও রয়েছে। সামগ্রিক মৃতের সংখ্যায় ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের সামরিক হতাহতের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত কিনা তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত সপ্তাহে শ্রীলঙ্কার উপকূলে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবির ঘটনায় কমপক্ষে ১০৪ জন নিহত হয়েছে। তবে রেড ক্রিসেন্ট তাদের পরিসংখ্যানে এই মৃত্যুর সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত করেনি। এছাড়াও ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকায় নিজেদের ‘স্ট্র্যাটেটিক রিজার্ভ’ বা কৌশলগত মজুত থেকে বাজারে তেল ছাড়ার নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাতটি উন্নত অর্থনীতির দেশের জোট জি-৭। গত মঙ্গলবার ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (আইইএ) নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের পর জি-৭ মন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, বৈঠকে দেওয়া সুপারিশগুলো সদস্য দেশগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়ার নীতিগত সমর্থন রয়েছে তাদের। প্রয়োজনে কৌশলগত তেল রিজার্ভও ব্যবহার করা হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (আইইএ) সদস্য সব দেশেরই ৯০ দিনের জন্য তেল মজুত করে রাখা বাধ্যতামূলক। তবে এই তেল নির্দিষ্ট কোনো জিওগ্রাফিক লোকেশন বা ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে রাখা হয় না। যেমন যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে শেল বা বিপির মতো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন টার্মিনাল ও শোধনাগারে এই তেল মজুদ করে রাখে এবং অন্য কোথাও মজুত করে রাখা তেলকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। মজুত থেকে তেল ছাড়ার অর্থ এটা নয় যে, বাজারে হঠাৎ করে তেলের বন্যা বয়ে যাবে বা পরিমাণ বেড়ে যাবে। বরং এর মাধ্যমে উৎপাদনকারীরা শোধনাগারগুলোর জন্য বাজারে আরো বেশি তেল সহজলভ্য করে দেয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেহেতু তেল শোধনের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে তাই এই মজুদ তেল ছেড়ে দেওয়া মানেই পেট্রোল বা জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো ‘ম্যাজিক সুইচ’ নয়। তাছাড়া, প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেলের মজুদের মধ্য থেকে কয়েকশ কোটি ব্যারেল ছেড়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ বারবার নেওয়া সম্ভব না। তাই এই তেল ছাড়ার বিষয়ে ‘প্রস্তুত থাকা’ বা ‘নীতিগতভাবে সম্মত হওয়া’, আসলে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই বাজারকে আশ্বস্ত করার একটি কৌশল মাত্র। তেলের এই মজুত ছাড়ার বিষয়টি আসলে একটি সংকেত, যার মাধ্যমে সরকারগুলো বোঝাতে চায়, তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন এবং সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এর ফলে তেলের দাম হয়তো কমবে না, তবে দাম আরও অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায়, সরবরাহের যে ঘাটতি তা তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। গত সোমবার তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে গিয়ে উঠেছিল। যদিও পরে দাম কিছুটা কমেছে, তবুও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো অনেক বেশি দামে তেল কেনাবেচা হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, দেশে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর পরই জি-৭ জোটের সদস্য দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং জাপান এই পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে তিনটি কার্গো জাহাজে হামলা
প্রকাশিতঃ মার্চ ১১, ২০২৬, ১৫:৪৮