নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গর্বের প্রতীক দেশ ও দেশের মানুষের। তবে সম্প্রতি পরিবারতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দী সংস্থাটি এক জ্যেষ্ঠ পাইলট ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের “চিফ অফ সেফটি” পদে থাকা এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রটোকল ভঙ্গসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ। সম্প্রতি এক আইনজীবীর করা নোটিশে বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা এধরণের তৎপরতা বিমানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
ব্যারিস্টার জাকির হোসেইন ভূইয়া প্রেরিত এক নোটিশে দাবি করা হয় ক্যাপ্টেন এনাম তালুকদার নামের বিমানের সিনিয়র ক্যাপ্টেন ও সেফটি বিভাগের প্রধান সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত চলাকালে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও বিমানের ককপিট থেকে ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করেন। যা ককপিটে ভিডিও ধারণ বিমানের নিজস্ব নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (ICAO) গাইডলাইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। এতে যাত্রীদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং বিমানের প্রতি আস্থা হ্রাস পেয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভিযুক্ত সেই চিফ সেফটি অফিসার চলন্ত বিমানের ভেতর থেকে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। বিষয়টি শুধুমাত্র বিমানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার (Crew Social Media & Security Protocols) লঙ্ঘন নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা (ICAO ও IATA নির্দেশিকা) এবং স্পর্শকাতর সামরিক তথ্য প্রকাশ নিষেধাজ্ঞারও লঙ্ঘন।
নোটিশটিতে দাবি করা হয় একজন চিফ সেফটি অফিসার যিনি বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তিনি কীভাবে এই ধরনের স্পর্শকাতর ও ভয়ংকর ভিডিও ধারণ ও প্রচার করতে পারেন, তা আমরা নাগরিক হিসেবে বুঝে উঠতে পারছি না।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকাশিত ভিডিওটি’র কারণে বিমানে ভ্রমণরত যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করছে, বিদেশি এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নজরদারি বৃদ্ধি এবং অনুমোদনে বিলম্ব, বিমানের প্রতি যাত্রীদের আস্থা হ্রাস পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতি এবং গোপন নেটওয়ার্কিং চ্যানেল ব্যবহারের অভিযোগে সাইবার ও সামরিক নিরাপত্তার হুমকি বাড়বে।
এদিকে এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এখানেই শেষ নয় ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি লন্ডনে ঐ অভিযুক্ত আটক হন মেয়াদোত্তীর্ণ পরিচয় পত্র ব্যবহারের দায়ে। ঘটনার দিন বিজি-২০২ (লন্ডন-ঢাকা) ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উক্ত পাইলট প্রয়োজনীয় এয়ারলাইন্স আইডি প্রদানে ব্যর্থ হন। লন্ডনের ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে বিমানবন্দরে আটকে রাখে। ফলে বিমানের ওই ফ্লাইটটি একজন মাত্র ক্যাপ্টেন ও একজন ফার্স্ট অফিসার দিয়ে পরিচালিত হয়—যা আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বিধি লঙ্ঘন করে। প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র বা Airlines Crew ID দেখাতে ব্যর্থ হন, যার ফলে যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে হিথ্রো বিমানবন্দরে আটক করে। যা আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ নিরাপত্তা নীতিমালার পরিপন্থি। পরবর্তীতে সেই পাইলট দেশে ফেরেন টিকিট কিনে যাত্রী হিসেবে।
তিনি সবচাইতে ভয়াবহ ঘটনার অবতারণা করেন ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট। দাম্মাম থেকে ঢাকাগামী বিজি ৩৫০ ফ্লাইটে জনৈক মোহাম্মদ শাহজালাল (৪২) এক যাত্রী বিমানে অসুস্থ হলে ক্রুগণ মেডিকেল সিচুয়েশন জানানোর পরও জরুরি ল্যান্ডিং না করে ঢাকায় ফিরে আসেন। যার ধারাবাহিকতায় ঐ যাত্রী হাসপাতালে পৌঁছা চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
উড়োজাহাজ পরিচালনা বিধি অনুযায়ী এমন পরিস্থিতি পাইলট তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি অবতরণ করবেন এবং যাত্রীর সুচিকিৎসা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেবেন। এমন বিধি অমান্য করার পরও এই পালটকে মুখোমুখি হতে হয়নি কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার।
২৭ আগস্ট ২০২৩ তারিখে দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, বিজি ৩৫০ ফ্লাইটে দাম্মাম থেকে ঢাকায় ফেরার সময় মোহাম্মদ শাহজালাল (৪২), একজন প্রবাসী শ্রমিক, ফ্লাইট চলাকালীন ভোর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ফ্লাইটটি তখন বাংলাদেশের আকাশসীমার বাইরে থাকলেও, ঢাকা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (ATC)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত অবতরণের অনুরোধ জানিয়ে ৩:২৫মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরে ভোর ৪টায় চিকিৎসক এসে যাত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনাটি বিমানের ঐ সিনিয়র পাইলট ও সেফটি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অধীনে ঘটলে অজ্ঞাত কারণে প্রতিবেদনে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। এই ধরনের সিদ্ধান্ত বিমান সেফটির মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থি এবং “Crew Resource Management” (CRM)-এর যথাযথ প্রয়োগে ঘাটতির ইঙ্গিত দেয় বলেও মন্তব্য করেন বিমান সংশ্লিষ্টরা।
এই পাইলট একাধারে নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হয়েও একাধিকবার দায়িত্বহীন, নীতিবহির্ভূত এবং নিরাপত্তা লঙ্ঘনমূলক আচরণ করেছেন। এই ধরনের কর্মকাণ্ড বিমানের গৌরব ও সুনামকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। প্রতিষ্ঠান ও দেশের স্বার্থে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অসমর্থিত একটি সূত্র জানায়, বিগত সরকারের শাসনামলে এই দাপটে কর্মকর্তাটি নিজেকে সাবেক নৌ-পরিবহণ মন্ত্রী শাহজাহান খানের ভাগ্নী জামাই পরিচয়ে চলেছেন দাপটের সাথে। পরে ২০২৪ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগের বহু আলোচিত নেতাকেই সে বিমানের ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের পরিচয় গোপন করে দেশ ত্যাগে সহায়তা করেন মোটা অঙ্কের বিনিময়ে।