সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী পরিষদের শপথ

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১৫:৪৫

স্টাফ রিপোর্টার: নতুন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথকে সামনে রেখে প্রশাসনজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, নিরাপত্তা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সময়ে বিদায়ী উপদেষ্টারা রেখে যাচ্ছেন ‘সাকসেসরস নোট’, আর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মন্ত্রিসভার গঠন নিয়ে চলছে আলোচনা ও প্রত্যাশার হিসাব-নিকাশ। সোমবার দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, নতুন মন্ত্রিসভার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মন্ত্রীদের তালিকা পাওয়ার পর তাদের জন্য যানবাহন, দেহরক্ষী, বাসস্থান, দপ্তর প্রস্তুতকরণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ—সবকিছুর ব্যবস্থা করতে হয়। এসব প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং সরকার সবসময় প্রস্তুত থাকে।
নাসিমুল গনি জানান, সকালে দুই দফায় নবনির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, এরপর বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ আয়োজন সম্পন্ন করতে কাজ করছে। নতুন মন্ত্রিসভার তালিকা কবে পাওয়া যাবেএ প্রশ্নে তিনি বলেন, তা নির্ভর করছে ইনকামিং প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর। নাম চূড়ান্ত হলে সবাই জানতে পারবেন। মন্ত্রিসভায় কতজন থাকবেন, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই নেবে; প্রশাসনের প্রস্তুতি স্ট্যান্ডার্ড প্রক্রিয়া অনুযায়ী থাকবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, দেশের একটি যুগসন্ধিক্ষণে তার ওপর বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। অতীতের মতোই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
নতুন মন্ত্রীদের আবাসনের প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, নতুন সরকারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের জন্য ৩৭টি বাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মিন্টো রোড, হেয়ার রোড, ধানমন্ডি ও গুলশান এলাকায় এসব বাড়ি অবস্থিত। প্রয়োজনে আরও বাড়ি প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা যে বাড়িগুলো ব্যবহার করছেন, সেগুলোর কিছু নতুন মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দ করা হবে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মন্ত্রিসভার গঠন নিয়ে জল্পনা চলছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভোলা-৩ আসনে বিজয়ী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন এবং যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই, তারাই অগ্রাধিকার পাবেন। জনগণের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়েই নতুন মন্ত্রিসভা হবে বলে তার মন্তব্য।
রাওয়া ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী-এর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনায় হাফিজ উদ্দিন বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশের ইতিহাসে অন্যতম সুষ্ঠু নির্বাচন। জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে এবং নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। তার বক্তব্য, দেশকে বিপথে নেওয়ার চেষ্টা হলে জনগণ তা প্রতিহত করবে।
এদিকে সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-এর সঙ্গে। সৌজন্য সাক্ষাতে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় হয় এবং দায়িত্বকালীন বিভিন্ন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে সেনাবাহিনীর সহযোগিতার জন্য প্রধান উপদেষ্টা সেনাপ্রধানকে ধন্যবাদ জানান। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে বিদায়ী উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকেও বক্তব্য এসেছে। শিল্প ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান জানান, তারা তিনটি মন্ত্রণালয়ে ‘সাকসেসরস নোট’ রেখে যাচ্ছেন। গত ১৮ মাসে নেওয়া উদ্যোগ, লক্ষ্য ও সংস্কার কার্যক্রমের বিবরণ সেখানে থাকবে। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রকে নতুন গতিতে আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা নোট পর্যালোচনা করে নিজেদের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবেন। কোন উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয়েছে এবং কী ধরনের কাজ নেওয়া হয়েছে—তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিছু সংস্কার সম্পূর্ণ হয়েছে, কিছু এখনো চলমান; সেগুলো ভবিষ্যৎ সরকার সম্পন্ন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আদিলুর রহমান খান বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছেই জানতে হবে। রিপোর্টের ভিত্তি কী তা আগে বোঝা প্রয়োজন। তার মতে, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সূচকের মূল্যায়ন সবসময় এক নয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া তিনটি ধারা এখন একসঙ্গে প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন সংসদ সদস্যদের শপথের মাধ্যমে আইনসভা কার্যক্রম শুরু হবে, বিকেলে শপথ নেবে নতুন মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শুরু করে গণপূর্ত, নিরাপত্তা ও অন্যান্য দপ্তর সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে বিদায়ী প্রশাসন তাদের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে লিখিত নথি রেখে যাচ্ছে। নতুন সরকারের সামনে থাকবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সংস্কার সম্পন্ন করা এবং অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মন্ত্রিসভার আকার ও কাঠামো নির্ধারিত হবে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বার্তা স্পষ্ট—সরকার দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত, প্রক্রিয়া সচল এবং আনুষ্ঠানিকতার সব আয়োজন চূড়ান্ত পর্যায়ে। আজ মঙ্গলবারের শপথের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্বে শুরু হবে নতুন অধ্যায়।
দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি ভেঙ্গে এবার প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজন করা হচ্ছে। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম সিরাজ মিয়া পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। বিএনপির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, অনুষ্ঠানে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন দেশি-বিদেশি অতিথি উপস্থিত থাকবেন। আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল এবং মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু। এছাড়া নেপালের বিদেশমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা ও শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নলিন্দা জয়তিসার-এর উপস্থিত থাকার সম্ভাবনার কথা জানা গেছে। যুক্তরাজ্যের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি সীমা মালহোত্রারও অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশের বিদেশমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে আইন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেছেন। নতুন সরকারের এই শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।